উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ নয়ছয়, জমি সংক্রান্ত কার্যক্রমে অবৈধ হস্তক্ষেপ এবং নিয়োগকে ঘিরে আর্থিক লেনদেনের ব্যাপক অভিযোগের মুখে অবশেষে ফেনীর জেলা প্রশাসক (ডিসি) মনিরা হককে প্রত্যাহার করেছে সরকার। বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে জেলা প্রশাসকের পদ থেকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। একই আদেশে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সচিব মোহাম্মদ মাহবুবউল হককে ফেনীর নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন নিয়োগ-২ শাখার উপসচিব জেতী প্রু স্বাক্ষরিত এই প্রজ্ঞাপন জারির মধ্য দিয়ে জেলাটিতে মনিরা হকের প্রায় সাড়ে দশ মাসের বিতর্কিত মেয়াদের অবসান ঘটল।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর ফেনীর ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই মনিরা হকের পদায়ন নিয়ে নানামুখী বিতর্ক চলছিল। তৎকালীন সময়ে জেলা প্রশাসক পদে পদায়নে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের যে অভিযোগ প্রশাসনিক মহলে উঠেছিল, তাতে তার নামও ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকেই স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, কৃষিজমি ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিয়মের অভিযোগ উঠতে থাকে। বিশেষ করে কৃষিজমি সুরক্ষা আইন প্রয়োগে শিথিলতা দেখিয়ে অবৈধ মাটি কাটা সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেওয়া, পরিবেশ আইন অমান্য করে চলা ইটভাটাকে ছাড় দেওয়া এবং মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়ার মতো নানা অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
মনিরা হকের মেয়াদে সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে গ্রামীণ খাল পুনঃখনন কর্মসূচির অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে। সরকারি তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলার পাঁচটি উপজেলার সাতটি প্রকল্পের আওতায় খাল পুনঃখননের জন্য মোট ১২ কোটি ২ লাখ ৭৫ হাজার ৪৭৮ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী অন্তত ৫০ শতাংশ স্থানীয় শ্রমিক নিয়োগ করে কাজ করানোর কথা থাকলেও তিনি তা অমান্য করে কেবল ভারী যন্ত্রপাতির মাধ্যমে নামমাত্র কাজ পরিচালনা করেন। প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ না করেই বিল তুলে নেওয়ার পাঁয়তারা চলাকালে গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী তথ্য প্রকাশিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠিত হলে অনিয়ম ধরা পড়ে। তদন্তের চাপের মুখে গত ৩১ জুলাই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বরাদ্দের প্রায় ৬৫ শতাংশ অর্থাৎ ৭ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৩৪৩ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ, যেখানে প্রকৃত ব্যয় হয়েছিল মাত্র ৪ কোটি ২১ লাখ টাকার মতো।
এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টির গুরুতর অভিযোগও রয়েছে সদ্য প্রত্যাহার হওয়া এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। দাগনভূঞা উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মাণের জমি নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর সুস্পষ্ট প্রতিবেদন ও সরকারি পরিপত্র উপেক্ষা করে তিনি নির্মাণকাজ স্থগিতের নির্দেশনা দেন বলে অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় প্রভাবশালী ভূমিদস্যু ও চাঁদাবাজ চক্রের সঙ্গে যোগসাজশে ইউপি ভবনের ওই জমিকে ওয়াকফ এস্টেটের সম্পত্তি সাজিয়ে তা বেহাত করার চেষ্টার অভিযোগ নিয়ে ইতোমধ্যে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর সুনির্দিষ্ট আবেদন জমা পড়েছে, যা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। এসব ধারাবাহিক অভিযোগ, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও তদন্ত প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপটেই সরকার তাকে জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।