রাজধানীর সর্বাধুনিক গণপরিবহন হিসেবে পরিচিত দেশের প্রথম বিদ্যুৎচালিত মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-৬ এখন বহুমাত্রিক কাঠামোগত ও কারিগরি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। উচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কারিগরি নিরাপত্তা নিরীক্ষা কমিটির সাম্প্রতিক মূল্যায়নে প্রকল্পটির অন্তত নয়টি সংবেদনশীল ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকি ও ত্রুটি চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ভায়াডাক্টের প্রায় ৭৩০টি বেয়ারিং প্যাডের অতিরিক্ত বিকৃতি, বিভিন্ন পিয়ার ও বক্স গার্ডারে স্পষ্ট ফাটল, ডিপো ও রেললাইনের ভিত্তি বা ভূমি বসে যাওয়া, ট্রেনের চলাচলের সময় অস্বাভাবিক কম্পন ও মারাত্মক ঝাঁকুনি এবং চাকার অস্বাভাবিক ক্ষয় অন্যতম। বিশেষজ্ঞরা পরিষ্কার জানিয়েছেন যে এগুলো কোনো সাধারণ রক্ষণাবেক্ষণজনিত বিষয় নয়, বরং নকশা যাচাইয়ের ঘাটতি, স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের তদারকির অনুপস্থিতি এবং নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত মান নিয়ন্ত্রণ না করার এক সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র ও কমিটির সদস্যদের বক্তব্যে জানা গেছে, পূর্ববর্তী সরকারের পক্ষ থেকে নির্ধারিত সময়ের আগেই দ্রুত রাজনৈতিকভাবে প্রকল্প উদ্বোধনের একপ্রকার অনাকাঙ্ক্ষিত তাগিদ ছিল। ফলে আন্তর্জাতিক ঠিকাদার ও জাপানি বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো প্রকল্পের বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বাধ্যতামূলক পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সম্পূর্ণ বাদ দিয়েই বাণিজ্যিকভাবে ট্রেন চলাচল শুরু করে দিয়েছিল। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোনো স্বাধীন দেশীয় কারিগরি তদারকি ছাড়া কেবল বিদেশি ঠিকাদারের ওপর অন্ধ নির্ভরতা এবং রাজনৈতিক প্রচারের জন্য সুরক্ষাজনিত পরীক্ষা এড়িয়ে যাওয়া মারাত্মক অপেশাদার সিদ্ধান্তের প্রমাণ। এর চরম খেসারত হিসেবে গত বছরের ২৬ অক্টোবর ফার্মগেট স্টেশনের সন্নিকটে পিয়ার থেকে ভারী বেয়ারিং প্যাড খসে পড়ে একজন পথচারী নিহত হন এবং একাধিক ব্যক্তি আহত হন। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর দায়ের হওয়া তিনটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত পুরো লাইনের কারিগরি অডিট পরিচালনার নির্দেশ দেন।
কমিটির বিশদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী লাইনের মোট বেয়ারিং প্যাডের প্রায় ২৩ দশমিক ২৮ শতাংশই বর্তমানে ত্রুটিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, যা জরুরি ভিত্তিতে প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন। এছাড়া বিস্তারিত কাঠামোগত নকশা, মডেল সিমুলেশন কিংবা ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেমের কোনো নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সনদপত্র পাওয়া যায়নি। ট্রেনের গতিশীল ভারের প্রভাব ও স্থায়ী কাঠামোর সক্ষমতা যাচাইয়ের আধুনিক ব্যবস্থা না থাকায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থেকে যায়। নির্ধারিত স্টপেজের আগেই হঠাৎ ট্রেন থেমে যাওয়া এবং চাকার অস্বাভাবিক ক্ষয়ের কারণে ইতোমধ্যে পাঁচটি সম্পূর্ণ ট্রেন সেটকে নিয়মিত যাত্রীসেবা থেকে সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে নিতে হয়েছে, যা এই মেগা কাঠামোর অপারেশনাল নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
শুধু কাঠামোগত বিষয়ই নয়, বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একাধিক বিপজ্জনক ফাঁকফোকর খুঁজে পেয়েছে কারিগরি কমিটি। লাইনের বিভিন্ন ট্রান্সফরমারে ত্রুটি, গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার অকার্যকারিতা, ওভারহেড তারে স্পার্কিং এবং ১৬টি স্টেশনের সিগন্যালিং ও পাওয়ার রুমে বৃষ্টির পানি প্রবেশের প্রমাণ মিলেছে। এই সমস্যাগুলো শর্টসার্কিট, হঠাৎ বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং সিগন্যাল ব্যবস্থা বিকল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রতিদিন প্রায় চার লাখ যাত্রী নিয়ে চলাচল করা ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেগা অবকাঠামোয় এ ধরনের অবহেলা সার্বিক যাত্রী নিরাপত্তাকে এক চরম সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
ঝুঁকি এড়াতে মেট্রো কর্তৃপক্ষ মূল লাইনের অন্তত দশটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ট্রেনের চলাচলের গতি মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। যেখানে নকশা অনুযায়ী ট্রেনের গতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১১০ কিলোমিটার থাকার কথা, সেখানে বাস্তবে তা নামিয়ে ৬০ থেকে ৯০ কিলোমিটারে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে ট্রেন তার চেয়েও কম গতিতে চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাময়িকভাবে গতি কমিয়ে তাৎক্ষণিক দুর্ঘটনা হয়তো এড়ানো সম্ভব, কিন্তু এটি কাঠামোগত স্থায়ী কোনো সমাধান নয়, বরং এর ফলে আধুনিক গণপরিবহনটির সামগ্রিক কর্মক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে।
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে কমিটির সুপারিশ আমলে নিয়ে কিছু পিয়ারে স্টিল ব্র্যাকেট বসানো, ক্র্যাক গেজ স্থাপন এবং বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করে ত্রুটি সংশোধনের প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে। তবে কারিগরি দল মনে করে, দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বাধীন পরামর্শক নিয়োগ করে পুরো রুটের ট্র্যাক-জ্যামিতি, মাটির অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য ও কাঠামোগত সক্ষমতা যাচাই করে স্থায়ী পুনর্বাসন নিশ্চিত করা ছাড়া এই মেগা প্রকল্পের টেকসই নিরাপত্তা অর্জন অসম্ভব। কোটি কোটি টাকার এই জাতীয় সম্পদের সুরক্ষা এবং সাধারণ যাত্রীদের জীবন বাঁচাতে কোনো প্রকার কালক্ষেপণ না করে দ্রুততম সময়ে সব ত্রুটি সারাই করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।