সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৩৭ অপরাহ্ন

মরণফাঁদে ইউরোপের স্বপ্ন: এক দশকে ৯ রুটে প্রাণ গেছে ২২শ বাংলাদেশীর

নিজস্ব প্রতিবেদক / ০ বার
প্রকাশ: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএমের ‘মিসিং মাইগ্র্যান্টস প্রজেক্ট’-এর সাম্প্রতিক হৃদয়বিদারক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের বাস্তব চিত্র। বিগত ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গত এক দশকের ব্যবধানে বিশ্বের অন্তত নয়টি ঝুঁকিপূর্ণ অনিয়মিত অভিবাসন রুটে ঘটা চুরাশিটি পৃথক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৩২৯ জন বাংলাদেশি এবং নিখোঁজ হয়েছেন আরও ৮৫৯ জন। অর্থাৎ সবমিলিয়ে ২ হাজার ১৮৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক উন্নত জীবনের রঙিন মোহে ইউরোপের উদ্দেশে পা বাড়াতে গিয়ে হয় গভীর সমুদ্রে চিরতরে হারিয়ে গেছেন, নয়তো বিদেশের মাটিতে সলিলসমাধি বরণ করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে উত্তর আফ্রিকার লিবিয়া কিংবা তিউনিসিয়া থেকে শুরু হওয়া বিপজ্জনক ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার যাত্রাপথে। অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানে গাদাগাদি করে ভেসে ইউরোপের উপকূলে পৌঁছানোর এই মরণখেলা কেবল মানব পাচারকারী ও লোভী দালালদের চক্রান্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি আমাদের সমাজব্যবস্থার গভীরে শেকড় গাড়া এক অন্ধ উচ্চাভিলাষ ও নিয়মহীন অভিবাসনপ্রবণতার বিপজ্জনক বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এই অবিরাম ও অনিয়ন্ত্রিত অবৈধ অভিবাসনের সরাসরি আঘাত এসে পড়ছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং পাসপোর্টের সার্বিক সক্ষমতার ওপর। দ্য হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স-এর পাসপোর্ট ইনডেক্সের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে যে বিশ্বের শক্তিশালী পাসপোর্টধারী দেশের তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে সিঙ্গাপুর, যার নাগরিকরা বিশ্বের ১৯২টি দেশে কোনো আগাম ভিসা ছাড়াই অবাধে ভ্রমণ করতে পারেন। এর বিপরীতে বিশ্বের ১০১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নেমে দাঁড়িয়েছে একেবারে তলানির দিকে, পঞ্চানব্বইতম স্থানে। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের পাসপোর্টধারীরা মাত্র ৩৭টি দেশে ভিসা ছাড়া বা অন-অ্যারাইভাল ভিসার সুবিধা নিয়ে প্রবেশ করতে পারছেন। অথচ মাত্র কয়েক বছর আগেও এই সংখ্যাটি অনেক বেশি ছিল এবং প্রতি বছরই এই সুবিধা ক্রমশ কমছে। কোনো দেশের পাসপোর্ট আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শক্তিশালী হবে নাকি দুর্বল হবে, তা নির্ভর করে মূলত সেই দেশের নাগরিকদের অন্য দেশে গিয়ে ভিসার মেয়াদের অতিরিক্ত সময় অবৈধভাবে অবস্থানের ঝুঁকি, অনিয়মিত অভিবাসন এবং অভ্যন্তরীণ আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। ফলে অবৈধভাবে বিদেশে থেকে যাওয়ার যে সাধারণ প্রবণতা আমাদের একাংশের নাগরিকদের মধ্যে রয়েছে, তা পুরো জাতির মর্যাদা ও বাকি কোটি কোটি বৈধ ভ্রমণপ্রত্যাশীর পথকে আন্তর্জাতিকভাবে সংকুচিত করে দিচ্ছে।
বাস্তবতা হলো, কেবল দালাল চক্রের ওপর সব দায়ভার চাপিয়ে দিয়ে এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। অনেকেই জাল সার্টিফিকেট, ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং বিভ্রান্তিকর কাগজপত্র তৈরি করে বৈধ উপায়ে ভিসার আবেদন করেন এবং এক দেশের ট্রানজিট ভিসা বা ভ্রমণ ভিসা নিয়ে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়ার অপকৌশল বেছে নেন। কর্মসংস্থানের নির্দিষ্ট ওয়ার্ক পারমিট বা নিয়মিত বৈধ কাগজপত্র ছাড়া কাজ করা এবং ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরও স্বেচ্ছায় লুকিয়ে থাকার কারণে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ দফায় দফায় ভিসা প্রদান স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। আমাদের দেশে বিদ্যমান বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন ২০১৩ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রিক্রুটিং এজেন্সি বা কোনো দালাল যদি ভুয়া ভিসা বা কার্যানুমতিপত্র সংগ্রহ ও বিক্রি করে, তবে তার বিরুদ্ধে অনধিক সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং জরিমানার কঠোর বিধান রয়েছে। কিন্তু যে নাগরিক নিজে জেনে-শুনে অতিরিক্ত অর্থের লোভে বা অনিয়মিত পথে বিদেশে যাওয়ার উদ্যোগ নেন কিংবা অবৈধভাবে অবস্থান করেন, তার বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি আইনি শাস্তিমূলক জবাবদিহির পরিষ্কার রূপরেখা নেই। ফলে যারা অবৈধ পথ বেছে নিচ্ছেন, তারা কোনো প্রকার জবাবদিহির মুখে না পড়ার কারণে সমাজে এই প্রবণতা দিন দিন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হচ্ছে।
এই তীব্র কাঠামোগত সংকট নিরসনে সরকারকে এখন সমন্বিত ও বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আইন সংস্কারের মাধ্যমে অবৈধভাবে গমনেচ্ছু ও অবস্থানকারী ব্যক্তিদের জন্য নির্দিষ্ট জরিমানা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে, যাতে অন্য কেউ এই জাতীয় আত্মঘাতী পথে পা বাড়াতে সাহস না পায়। একই সঙ্গে দেশে বৈধ, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ অভিবাসনের পরিধি ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ জমিজমা বিক্রি করে কিংবা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে দালালদের খপ্পরে পড়তে বাধ্য না হন। কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে বৈধ উপায়ে কাজের সুযোগ বৃদ্ধি করা এবং প্রতিটি জেলায় অনিয়মিত অভিবাসনের ভয়াবহ ঝুঁকি ও শাস্তির বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তরুণদের অমূল্য জীবন ভূমধ্যসাগরের তলদেশে বিলীন হওয়া থেকে রক্ষা করতে এবং বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজ পাসপোর্টের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে এখনই রাষ্ট্রকে জিরো টলারেন্স নীতিতে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
তথ্যসূত্র: বণিকবার্তা


এ জাতীয় আরো খবর...