বর্তমান ডিজিটাল যুগে স্মার্টফোনের সহজলভ্যতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির অসাধু চক্র অভিনব কায়দায় অনলাইন লোন বা ঋণের ফাঁদ তৈরি করেছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম এবং গুগল প্লে স্টোরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা প্রায় ৩০টিরও বেশি অনুমোদনহীন মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন বা অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে বা তাৎক্ষণিক আর্থিক সংকটে পড়ে অনেকেই না বুঝে এসব অ্যাপ ডাউনলোড করে ফাঁদে পা দিচ্ছেন। ‘সাথী লোন’, ‘ফিনক্যাশ’, ‘কুইক লোন’ কিংবা ‘বঙ্গক্যাশ’-এর মতো নামসর্বস্ব ও ভুয়া অ্যাপগুলো নামমাত্র শর্তে ঋণ দেওয়ার লোভ দেখালেও পরবর্তীতে অবিশ্বাস্য রকমের চড়া সুদ এবং অনৈতিক উপায়ে অর্থ আদায়ের পথ বেছে নিচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, নামমাত্র ৬ হাজার টাকা ঋণ নেওয়ার পর মাস ঘুরতে না ঘুরতেই চক্রান্তকারী চক্র সুদে-আসলে তার বিপরীতে প্রায় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে, যা এক প্রকার ৮০০ শতাংশ পর্যন্ত অবিশ্বাস্য সুদের হারকে ছাড়িয়ে যায়। এছাড়া অন্য এক ভুক্তভোগীর ২৪ হাজার টাকার ঋণের বিপরীতে এক সপ্তাহ পরেই সুদসহ ৮১ হাজার টাকা দাবি করার মতো চাঞ্চল্যকর তথ্যও উঠে এসেছে।
এ ধরনের অবৈধ ঋণদানকারী অ্যাপগুলোর কার্যপদ্ধতি অত্যন্ত সুকৌশলী ও গোপনীয় হওয়ায় সাধারণ গ্রাহকরা খুব দ্রুত তাদের পাতা জালে আটকা পড়েন। ঋণের জন্য আবেদন করার সময় অ্যাপগুলো ইনস্টল করার বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে ব্যবহারকারীর মুঠোফোনের কন্টাক্ট লিস্ট বা ফোনবুক, ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও এবং মেসেজসহ সংবেদনশীল বিভিন্ন তথ্য অ্যাক্সেস করার অনুমতি বা পারমিশন নিয়ে নেয়। পরবর্তীতে কেউ যদি অতিরিক্ত সুদ বা বকেয়া টাকা পরিশোধ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন, তবে চক্রটির পক্ষ থেকে ওই ব্যক্তির মুঠোফোনে থাকা আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের নম্বরে ফোন করে নানা ধরনের মানহানিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্যান্য মাধ্যমে বিকৃত ছবি পাঠিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও চালানো হয়। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে এই ধরনের অনলাইন লোন অ্যাপের জেরে ভুক্তভোগী যুবকদের আত্মহত্যার মর্মান্তিক একাধিক ঘটনা ঘটার নজির থাকলেও আমাদের দেশে এখনো প্রশাসনিক তদারকি ও সচেতনতার অভাবে এর পরিধি দিন দিন বেড়েই চলেছে।
অবৈধভাবে পরিচালিত এসব আর্থিক অ্যাপের পেছনে কোনো বৈধ লাইসেন্স, সুনির্দিষ্ট অফিস বা স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় ভুক্তভোগীরা আইনি সহায়তা পেতেও ব্যাপক জটিলতার মুখে পড়ছেন। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা নিবন্ধিত ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়া ডিজিটাল মাধ্যমে এভাবে যত্রতত্র লোন বা ঋণ বিতরণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা অন্যান্য নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার কার্যকর নজরদারির অভাবেই এই অবৈধ চক্রগুলো অবাধে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র বিশেষ করে কম্বোডিয়া, লাওস ও মিয়ানমার সীমান্তের অনলাইন প্রতারক চক্রের আদলে গড়ে ওঠা এসব সিন্ডিকেট বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সংখ্যা কম থাকলেও ভুক্তভোগীদের নীরবতা এবং সামাজিক মর্যাদার ভয়ে মুখ না খোলার প্রবণতা অপরাধীদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে। তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এই সাইবার অপরাধ ভয়াবহ রূপ ধারণ করার পূর্বেই কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং জোরালো সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।