জুলাইয়ের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে জোর তৎপরতা শুরু করেছে। নির্বাচন-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটি বহির্বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও মতবিনিময় চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বমঞ্চে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি, রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা, শাসনব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পরিকল্পনাগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরাই দলটির এই ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতার মূল লক্ষ্য হিসেবে দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের এই দলের কূটনৈতিক মহলে এমন সরব উপস্থিতি দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিক।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম এবং দলটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সেলের প্রধান ও মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নেতৃত্বে দলের আন্তর্জাতিক উইং নিয়মিতভাবে বিদেশি কূটনীতিক ও মিশন প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করছে। এসব দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় কেবল বাংলাদেশের বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিই নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাচ্ছে। রাজধানী ঢাকার কূটনৈতিক পাড়ায় অবস্থিত বিভিন্ন দেশের দূতাবাস এবং বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই আলোচনাগুলো পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে এনসিপির আন্তর্জাতিক সেলের একটি শীর্ষ প্রতিনিধিদল বৈঠক করে। ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসে অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দীর্ঘমেয়াদি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় হয়। উভয় পক্ষই অব্যাহত কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা এবং ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে। এই বৈঠকে এনসিপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও প্রবাসী কল্যাণ বিষয়ক উপ-কমিটির শীর্ষ প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও অভিন্ন উন্নয়নের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরেন।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট বা আইআরআই-এর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এসে দলটির মুখপাত্রের সঙ্গে বিশেষ বৈঠক সম্পন্ন করেছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশে পরিচালিত তাদের সর্বশেষ জাতীয় জনমত জরিপের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন এনসিপি নেতৃত্বের হাতে তুলে দেওয়া হয়। বৈঠকে জরিপের ফলাফল, নাগরিক প্রত্যাশা, তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা এবং একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার উপায় নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে গভীর আলোচনা হয়। গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও নিয়মিত রাজনৈতিক সংলাপের অপরিহার্যতা সম্পর্কেও তারা একমত পোষণ করেন।
পশ্চিমা গণতান্ত্রিক বিশ্বের সঙ্গেও এনসিপি নিজেদের কূটনৈতিক সংযোগ জোরদার করেছে। যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বাংলাদেশের সংসদীয় কার্যক্রমের সংস্কার, আইনসভার জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং যুক্তরাজ্য-বাংলাদেশ ঐতিহাসিক সহযোগিতার সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। এর পাশাপাশি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের বাংলাদেশ সফরকালীন সময়ে তাঁর সঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ফলপ্রসূ বৈঠক করে, যেখানে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে অংশীদারত্ব বৃদ্ধির প্রসঙ্গ প্রাধান্য পায়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো পরাশক্তিগুলোর কূটনীতিকদের উপস্থিতিও এনসিপির কার্যালয়ে লক্ষ করা গেছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন এনসিপি কার্যালয়ে এসে দলটির নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নির্বাচন-পরবর্তী সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। এছাড়া ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে এবং জার্মানির চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স আনজা কের্স্টেন যৌথভাবে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে টেকসই গণতন্ত্র বিনির্মাণ ও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে নিজেদের অভিমত প্রকাশ করেন। আঞ্চলিক সৌহার্দ্যের অংশ হিসেবে সম্প্রতি ঢাকায় পাকিস্তানের হাইকমিশনারের বাসভবনে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত অগ্নিকাণ্ডে আহত হাইকমিশনার ইমরান হায়দারকে দেখতে হাসপাতালে যান এনসিপি নেতারা এবং তাঁর প্রতি গভীর সহমর্মিতা জানান।
দলটির নীতিনির্ধারক ও কেন্দ্রীয় নেতারা স্পষ্ট করেছেন যে তাদের এই কূটনৈতিক যোগাযোগের মূল চালিকাশক্তি হলো বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের মানুষ যে রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে, সেই বাস্তবতাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি। কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের প্রতি পক্ষপাতিত্ব না করে সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং দেশের সার্বিক স্বার্থকে সমুন্নত রেখেই এনসিপি তাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বৈদেশিক কূটনীতি আগামী দিনগুলোতে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।