ডিজিটাল বাংলাদেশের যুগে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এখন এক চরম হুমকির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে| সরকারের বিভিন্ন সংবেদনশীল সার্ভার থেকে সাধারণ মানুষের তথ্য বেহাত হওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না| সম্প্রতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের এক চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, সাধারণ মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), কল রেকর্ড এবং রিয়েল-টাইম লোকেশন বা অবস্থানের তথ্য ইন্টারনেটে একেবারে খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে| গত ১৫ জুন থেকে ১৫ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত টানা এক মাস ধরে চালানো এই গভীর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং বেশ কিছু ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এসব স্পর্শকাতর তথ্য অনায়াসেই কেনাবেচা চলছে| তথ্য বিক্রির জন্য তৈরি করা ৬০০টিরও বেশি ফেসবুক পোস্ট এবং অন্তত ১০টি ওয়েবসাইটের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা|
ডিসমিসল্যাবের গবেষকরা নিজেদের অনুসন্ধানের স্বার্থে এবং বিক্রেতাদের দাবির সত্যতা যাচাই করার জন্য তিনজন আলাদা বিক্রেতার কাছ থেকে সরাসরি তথ্য কিনেছেন| তাদের এই যাচাই প্রক্রিয়ায় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, বিক্রেতারা যেসব তথ্য সরবরাহ করছে তা সম্পূর্ণ নির্ভুল এবং আসল| অনলাইনে বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা এসব তথ্যের তালিকায় এনআইডি ও ভোটার আইডির বিস্তারিত তথ্য, জন্মনিবন্ধন রেকর্ড, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, লোকেশন বা অবস্থান, ব্যক্তিগত এসএমএস-এর তালিকা, মোবাইলের আইএমইআই নম্বর, কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিন), পাসপোর্টের গোপনীয় তথ্য এমনকি মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) স্টেটমেন্ট পর্যন্ত রয়েছে| সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, চাহিদামত অর্থ পরিশোধ করার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিক্রেতারা এসব তথ্য ক্রেতার হাতে পৌঁছে দিচ্ছে|
নাগরিকদের তথ্য ফাঁসের এই ভয়াবহ ঘটনা দেশে এবারই প্রথম নয়| বিগত কয়েক বছর ধরেই সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডেটাবেজ এবং সার্ভার থেকে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য বেহাত হওয়ার এক ধারাবাহিক সংস্কৃতি চলে আসছে| ২০২৩ সালে ভিক্টর মার্কোপোলোস নামের একজন আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা গবেষক প্রথম একটি বিশাল নিরাপত্তা ত্রুটি ধরিয়ে দেন| তিনি দেখতে পান, রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের অধীনস্থ জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন ওয়েবসাইটের দুর্বলতার কারণে লাখ লাখ নাগরিকের নাম, ফোন নম্বর, ইমেইল ঠিকানা এবং এনআইডি নম্বর ইন্টারনেটে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত অবস্থায় পড়ে আছে| পরবর্তীতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের তরফ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তারা ঠিক কত মানুষের তথ্য ফাঁস হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান বের করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়| এমনকি এই মারাত্মক গাফিলতির পেছনে কাদের হাত ছিল, সেটিও তারা শনাক্ত করতে পারেনি|
এর আগে ওই একই বছর টেলিগ্রামে অত্যন্ত সংবেদনশীল এনআইডি তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর নির্বাচন কমিশন তাদের এনআইডি সেবার সাথে যুক্ত ১৭১টি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সার্ভার নিয়ে তদন্ত শুরু করেছিল| তখন সাইবার বিশেষজ্ঞরা সার্বক্ষণিক মনিটরিং, নিয়মিত সিকিউরিটি টেস্টিং এবং অ্যাক্সেস কন্ট্রোল আরও কঠোর করার পরামর্শ দিয়েছিলেন| কিন্তু সেই পরামর্শ যে খুব একটা কাজে আসেনি, তার প্রমাণ মেলে ২০২৪ সালে| ওই বছর পুলিশ তদন্তে নেমে বেশ কয়েকজন অসাধু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে, যারা আসল এনআইডি এবং ফোনের গোপন রেকর্ড বিক্রির বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিল| তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, খোদ নির্বাচন কমিশনের কর্মীদের লগইন ক্রেডেনশিয়াল এবং ওটিপি ব্যবহার করে এই চক্র এনআইডি সার্ভার থেকে নিয়মিত তথ্য চুরি করছিল|
সবচেয়ে বড় আঘাত আসে যখন নির্বাচন কমিশনের ডেটা সেন্টারের সাবেক পরিচালক তারেক এম বরকতুল্লাহকে গ্রেপ্তার করা হয়| তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, তিনি ১১ কোটিরও বেশি নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের একটি ‘মিরর কপি’ বা হুবহু প্রতিলিপি তৈরি করে তা বেহাত করেছেন, যা দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক অকল্পনীয় হুমকি| এরপর ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আরেকটি ভয়াবহ তথ্য সামনে আনে| তারা জানায়, নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে এক মাসের ব্যবধানে ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬০৮ জনের এনআইডি রেকর্ড বেআইনিভাবে অ্যাক্সেস করা হয়েছে| এর রেশ কাটতে না কাটতেই গত জুনে অনলাইনে ভোটার তালিকা বিক্রির চাঞ্চল্যকর প্রমাণও পায় ডিসমিসল্যাব|
সরকারি বিভিন্ন সংস্থা বারবার এসব তথ্য ফাঁসের ঘটনার তদন্ত করেছে, কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠানের সার্ভার অ্যাক্সেস বাতিল করেছে এবং তথ্য চুরির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নিয়েছে| পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের অননুমোদিত ব্যবহারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে কঠোর আইনও প্রণয়ন করা হয়েছে| কিন্তু এত সব উদ্যোগের পরও অনলাইনে তথ্য বিক্রির এই অবৈধ বাণিজ্য আজও বহাল তবিয়তে চলছে| সরকারের সাইবার নিরাপত্তা কাঠামোর এই চরম দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে হ্যাকার এবং সাইবার অপরাধীরা সহজেই স্পর্শকাতর তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে| জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কার্যালয়, নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে সরকারি প্রায় প্রতিটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট হ্যাকারদের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে|
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ নাগরিকদের মনে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে| নাগরিকদের জন্য এখন প্রশ্নটি এমন নয় যে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য আদৌ ফাঁস হবে কি না, বরং প্রশ্ন হলো ঠিক কখন তা হ্যাকারদের হাতে চলে যাবে| ব্যক্তিগত তথ্যের এই অবাধ কেনাবেচা মূলত আইডেন্টিটি থেফট বা পরিচয় চুরির মতো ভয়ংকর অপরাধের জন্ম দিচ্ছে| অপরাধীরা অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া, জালিয়াতি করা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা বা নিরপরাধ কাউকে ফাঁসানোর মতো জঘন্য কাজ করতে পারে| তাই কেবল তদন্ত কমিটি গঠন আর লোক দেখানো প্রতিবেদন জমা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না| নাগরিকদের এই ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এখনই প্রযুক্তিগতভাবে নিশ্ছিদ্র ও কঠোর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে| অন্যথায়, দেশের কোটি কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত এই সাইবার জালিয়াতদের শিকারে পরিণত হতেই থাকবেন এবং ডিজিটাল কাঠামোর ওপর থেকে মানুষের আস্থার চিরতরে পতন ঘটবে|