বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৪ পূর্বাহ্ন

বড় ঋণখেলাপিদের ১৫ বছরের ছাড়: অর্থনীতিতে ৬০ হাজার কোটির তহবিল

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাকাকে ফের সচল করতে এবং ব্যাংকিং খাতকে এক চরম বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক| বিশেষ করে যেসব বড় ও ভারী শিল্পগোষ্ঠীর খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকার ওপরে, তাদের জন্য ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে এক বিশাল ও অভূতপূর্ব ছাড়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে| বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল এ বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, বিশাল অঙ্কের এই ঋণখেলাপিরা তাদের ঋণ নবায়ন বা পুনঃতফসিল করার পর তা পুরোপুরি পরিশোধের জন্য দীর্ঘ ১৫ বছর পর্যন্ত সময় পাবেন| শুধু তাই নয়, এই পুনঃতফসিলের পর প্রথম দুই বছর তাদের কোনো ধরনের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না, যা তাদের জন্য ‘গ্রেস পিরিয়ড’ বা ঋণ পরিশোধের বিরতি হিসেবে বিবেচিত হবে| তবে তুলনামূলক ছোট অর্থাৎ এক হাজার কোটি টাকার কম অঙ্কের ঋণখেলাপিদের জন্য এই ধরনের বড় সুযোগ রাখা হয়নি| এই অভাবনীয় সুবিধার পাশাপাশি বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়াতে এবং উৎপাদনমুখী খাতকে চাঙ্গা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল প্রণোদনা তহবিলও গঠন করেছে| ভর্তুকি সুদের এই বিশাল তহবিল থেকে আজ ১ সেপ্টেম্বর থেকেই ঋণ বিতরণ শুরু করার জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে| আগামী ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এই চার মাসের মধ্যেই নির্ধারিত ৬০ হাজার কোটি টাকা বিতরণের একটি বিশাল লক্ষ্যমাত্রা ব্যাংকগুলোর জন্য বেঁধে দেওয়া হয়েছে|
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত খেলাপি ঋণের পাহাড় কমিয়ে এনে বন্ধ হয়ে যাওয়া বা ধুঁকতে থাকা কলকারখানাগুলোকে পুনরায় সচল করার লক্ষ্যেই এই বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে| কর্মকর্তারা জানান, সদ্য বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের দীর্ঘ শাসনামলে সততার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করতে গিয়ে অনেকেই নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন| সেই ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অনেকেই এখন নতুন করে ব্যবসা দাঁড় করাতে প্রণোদনা ঋণ নেওয়ার জন্য আবেদন করছেন, কিন্তু আগের ঋণ খেলাপি হয়ে থাকায় তারা নিয়মানুযায়ী নতুন ঋণ পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছেন না| এর পাশাপাশি দেশে চলমান তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় বহু বড় ও প্রতিষ্ঠিত শিল্প গ্রুপের ঋণও খারাপ ঋণে পরিণত হয়ে পড়ছে| পরিস্থিতি সামাল দিতেই মূলত এক হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপিদের এই বাড়তি সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে| কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে জানা গেছে, দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গোষ্ঠী সিটি গ্রুপ এবং জিপিএইচ ইস্পাতসহ বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এই ধরনের বিশেষ সুবিধা চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন ও যোগাযোগ করেছিল| মূলত তাদের সেই বাস্তবতা ও চাহিদাগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করেই বৃহত্তর স্বার্থে বড়দের জন্য এই সুবিশাল ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে|
নতুন প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, ২০২৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক যে নীতিসুবিধা ঘোষণা করেছিল, তার আওতায় খেলাপিমুক্ত হতে আগ্রহী ব্যবসায়ীদের চলতি সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই নতুন করে আবেদন জমা দিতে হবে| বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে এই আবেদনগুলো চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করতে বলা হয়েছে| যারা এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিসহায়তার আওতায় সুবিধা গ্রহণ করেছিলেন, তারাও চাইলে নতুন করে এই বর্ধিত সুবিধার জন্য আবেদন জমা দিতে পারবেন| এর আগে ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর জারি করা বাংলাদেশ ব্যাংকের অপর এক প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, ব্যাংকার ও গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিদ্যমান খেলাপি ঋণের স্থিতির ওপর কমপক্ষে ২ শতাংশ নগদ অর্থ ডাউনপেমেন্ট বা এককালীন হিসেবে জমা দিতে হবে| ওই শর্ত মেনে ঋণ নিয়মিত হলে ২ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ তা পরিশোধের জন্য মোট ১০ বছর সময় পাওয়া যেত| তবে কোনো ঋণ যদি এর আগে তিন বা তার চেয়ে বেশিবার পুনঃতফসিল করা হয়ে থাকে, তবে শর্ত অনুযায়ী অতিরিক্ত আরও ১ শতাংশ অর্থ জমা দেওয়ার নিয়ম ছিল| সেই আগের সুবিধার মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে বড় পরিসরে তাদের এই সুযোগ দেওয়া হলো|
বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক লিখিত বিবৃতিতে এই সুবিধার পেছনের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের রপ্তানি খাতেও সাময়িক সময়ের জন্য একটি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে| বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী জ্বালানিসংকটের কারণে দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক উৎপাদন সাময়িকভাবে মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে, যা সরাসরি ওইসব প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকের ঋণ পরিশোধ করার সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে| অপর দিকে, দেশের ব্যাংকিং খাতে বাজারভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে ঋণগ্রহীতা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সুদব্যয় আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে| একদিকে সুদব্যয় বৃদ্ধি এবং অন্যদিকে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক মন্দার কারণে ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা একেবারেই তলানিতে এসে ঠেকেছে| বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানিয়েছে যে, দেশব্যাপী খেলাপি ঋণ ধাপে ধাপে কমিয়ে আনতে তারা সম্প্রতি ১৮ মাসের একটি দীর্ঘমেয়াদী রোডম্যাপ গ্রহণ করেছে| এই চলমান রোডম্যাপের একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবেই বর্তমান নীতিমালাটি জারি করা হয়েছে| এর মাধ্যমেই মূলত ঋণগ্রহীতাদের, বিশেষ করে বৃহৎ ঋণগ্রহীতাদের পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত সময়টুকু দেওয়া হয়েছে যাতে করে তারা দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচতে পারেন|
তবে এই সুবিধা দেওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান খেলাপি ঋণের চিত্রটি অত্যন্ত ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক| গত মার্চ মাস শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়| প্রবীণ ব্যাংকার ও বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে ব্যাংক খাতে যে নজিরবিহীন অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও দুর্নীতির মহোৎসব চলেছে, মূলত তার উচ্চমাত্রার প্রভাবেই খেলাপি ঋণের পাহাড় আজ আকাশ ছুঁয়েছে| ওই সময়ে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, প্রিমিয়ার গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, হল-মার্ক গ্রুপসহ সরকার-ঘনিষ্ঠ কয়েকটি গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বের করে নিয়েছে| এছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকে সংঘটিত স্মরণকালের বড় কেলেঙ্কারির ঘটনাগুলোতে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে ফুলেফেঁপে ওঠে| পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, একীভূত করা পাঁচটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বর্তমানে তাদের মোট ঋণের ৮০ শতাংশেরও বেশি| বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাব বলছে, গত ডিসেম্বর মাস শেষেও ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা| মার্চ শেষে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে তা অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে গেছে আরও ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা| অথচ এই তিন মাসের ব্যবধানে দেশে মোট ঋণ বিতরণ বেড়েছে মাত্র ৪ হাজার কোটি টাকার মতো| অর্থাৎ ঋণ যতটুকু বেড়েছে, তার চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি গতিতে বেড়েছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ| মার্চ মাস শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকায়, যার মধ্যে এখন ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশই খেলাপির খাতায় নাম লিখিয়েছে|
বড়দের জন্য দেওয়া এই বিশাল সুযোগের বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান মন্তব্য করেছেন যে, স্থবির হয়ে পড়া ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা করতে এবং উদ্যোক্তাদের ওপর তৈরি হওয়া চাপ সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংক এই সুযোগ দিয়ে একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছে| কারণ এখন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি বিশ্ববাজারে ভোগ্যপণ্যের দামও অনেক বেড়ে যাওয়ায় শিল্পের উৎপাদন খরচ বেড়েছে| তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই সুযোগটি কোনোভাবেই যেন গণহারে সবাইকে দেওয়া না হয়| যেসব ব্যবসায়ী অতীতে পরীক্ষিত ও ভালো ছিলেন এবং কেবল বর্তমান পরিস্থিতির শিকার হয়েই ব্যবসায়িকভাবে চরম খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়েছেন, শুধুমাত্র কঠোর যাচাই-বাছাই করে তাদেরকেই এই সুযোগ দেওয়া যেতে পারে| তাহলে দেশবাসী এবং ব্যাংকিং খাতের কাছে একটি ইতিবাচক ও ভালো বার্তা যাবে| অন্যদিকে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্যাংক খাত বর্তমানে যে গভীর অন্ধকার গহ্বরে নেমে গেছে, তা থেকে পুরো খাতটিকে উদ্ধার করতে হলে ব্যতিক্রমী কিছু পদক্ষেপ অবশ্যই নিতে হবে| বাংলাদেশ ব্যাংক মূলত সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছে| তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, অতীতে ব্যাংকিং খাতে কোনো ধরনের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সরাসরি অনিয়ম ও লুটপাট করার জন্যই এই ধরনের সুযোগ দেওয়া হতো| কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতির কারণে যারা সত্যিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সেই প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করতেই এই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে| তবে তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন যে, যারা সত্যিকারের ব্যবসায়ী এবং ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, তাদের অবশ্যই এই সুযোগ দেওয়া যেতে পারে| কিন্তু যারা দেশের টাকা বিদেশে পাচার করেছে এবং ব্যাংকের অর্থ নির্মমভাবে লুটপাট করেছে, তাদের বিন্দুমাত্র ছাড় না দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে হবে| পরিশেষে তিনি উল্লেখ করেন, সর্বোচ্চ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কঠোর অর্থনৈতিক সুশাসন বজায় রেখেই কেবল এই নীতির সফল প্রয়োগ সম্ভব, অন্যথায় এই সুবিধাও দুর্নীতিবাজদের পকেটেই যাবে|
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো


এ জাতীয় আরো খবর...