দেশের জ্বালানি খাতকে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার একটি নতুন উদ্যোগকে ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কা। পরিশোধিত জ্বালানি তেল সরাসরি আমদানি এবং বাজারজাত করার জন্য বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে ঢালাওভাবে অনুমতি দেওয়া হলে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে বলে কঠোরভাবে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) একটি বিশেষ পর্যালোচনা কমিটি। কমিটির মতে, এই ধরনের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের ফলে সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাবে। একই সঙ্গে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি, অবৈধভাবে তেল মজুত, চরম মূল্যস্ফীতি এবং নিম্নমানের জ্বালানি সরবরাহের মতো ভয়ংকর সব ঝুঁকি তৈরি হবে, যা চূড়ান্ত অর্থে রাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তাকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলে দেবে।
পুরো ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ২৪ মে, যখন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (বিওজিসিএল) পরিশোধিত জ্বালানি তেল সরাসরি আমদানির অনুমতি চেয়ে সরকারের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দেয়। এই অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রস্তাবটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করার জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ গত ১৪ জুলাই একটি ১১ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। বিপিসির পরিচালক (অপারেশনস) এ কে মোহাম্মদ শামসুল আহসানের নেতৃত্বে গঠিত এই বিশেষজ্ঞ কমিটি বিষয়টির খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করে। মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়, ১৯ জুলাই কমিটি তাদের বিস্তারিত নয় পৃষ্ঠার একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির তীব্র বিরোধিতা করে বলা হয়, জ্বালানি তেল কোনো সাধারণ ভোগ্যপণ্য নয়, বরং এটি জাতীয় স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি অতি কৌশলগত ও স্পর্শকাতর পণ্য।
তবে এই বিশেষজ্ঞ কমিটির দেওয়া জোরালো সতর্কবার্তাকে যে খুব একটা আমলে নেওয়া হয়নি, তার প্রমাণ মেলে পরবর্তী নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহে। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ঠিক সাত দিন পর আকস্মিকভাবে বিপিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানকে তার পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। এই রদবদলের রেশ কাটতে না কাটতেই গত ৬ আগস্ট জ্বালানি বিভাগ থেকে বিপিসিকে একটি নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়। ওই নির্দেশনায় ‘বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ এবং বাজারজাতকরণ নীতিমালা, ২০২৬’ এর একটি খসড়া দ্রুত প্রণয়ন করার জন্য বিপিসিকে সুস্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করা হয়। বর্তমান বিপিসি চেয়ারম্যান মো. মনজুর আলম প্রধানের কাছ থেকে এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিওজিসিএল সরকারের কাছে যে প্রস্তাব জমা দিয়েছে, তার পরিসংখ্যানে চোখ রাখলে যেকোনো সচেতন মানুষ আঁতকে উঠবেন। কোম্পানিটি একাই প্রতি বছর ১৫ থেকে ২০ লাখ টন ডিজেল, ২ লাখ টন অকটেন, দেড় লাখ টন পেট্রোল এবং ৮ থেকে ১০ লাখ টন ফার্নেস অয়েল আমদানির অনুমতি চেয়েছে। অথচ বর্তমানে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মোট বার্ষিক চাহিদা হলো ৬৮ থেকে ৭০ লাখ টন। হিসাব করলে দেখা যায়, একটি মাত্র কোম্পানিকে এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানির অনুমতি দেওয়া হলে দেশের মোট জ্বালানি বাজারের প্রায় ৩৭ থেকে ৪৮ শতাংশই সরাসরি তাদের একক নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এর মানে হলো, দেশের জ্বালানি বাজারের প্রায় অর্ধেকটাই একটি মাত্র বেসরকারি কোম্পানির মর্জির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা একচেটিয়া আধিপত্য বা শক্তিশালী মনোপলি তৈরির পথকে সুগম করবে।
বিপিসি বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে এবং বিদেশ থেকে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে সরকারিভাবে নির্ধারিত নির্দিষ্ট মূল্যে সারা দেশে নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা বিতরণ করে থাকে। বৈশ্বিক বাজারে যখন জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী থাকে, তখনো বিপিসিকে জনগণের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে লোকসান দিয়ে বা ভর্তুকি মূল্যে তেল বিক্রি করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, আন্তর্জাতিক বাজারে কেনা দাম বেশি থাকা সত্ত্বেও বিপিসি দেশের ভেতরে ১১৫ টাকা লিটার দরে ডিজেল বিক্রি করেছে। কিন্তু বেসরকারি আমদানিকারকরা কখনোই জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করবে না। কমিটির প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বেসরকারি কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসা পরিচালনা করবে সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং নিজেদের সর্বোচ্চ মুনাফার ওপর ভিত্তি করে।
জ্বালানি তেল যেহেতু দেশের পরিবহন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং কৃষিখাতের নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাই এর সরবরাহ কোনোভাবেই বিঘ্নিত হওয়া চলবে না। কিন্তু বেসরকারি খাত মুনাফার লোভে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার আভাস পেলেই তেল মজুত করে দেশে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারে। আবার দাম বেশি থাকলে তারা আমদানি কমিয়ে দিতে পারে, যার ফলে দেশে জ্বালানির তীব্র হাহাকার দেখা দেবে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত বাজারে সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও সেবার মূল্য বাড়িয়ে দিয়ে মূল্যস্ফীতির আগুন উসকে দেবে। এছাড়া কোনো কারণে সরকারের সঙ্গে নীতিগত মতানৈক্য তৈরি হলে বেসরকারি কোম্পানিগুলো তেল সরবরাহ বন্ধ করে সরকারকে জিম্মি করার ঘোষণাও দিতে পারে।
বিপিসির বর্তমান যে সুদৃঢ় ও দেশব্যাপী বিস্তৃত সাপ্লাই চেইন রয়েছে, বেসরকারি খাত সেই দায়িত্ব নিলে তা ভেঙে পড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। বেসরকারি অপারেটররা সবসময় ঢাকা, চট্টগ্রাম বা অন্যান্য বড় শহর এবং শিল্পাঞ্চলগুলোর মতো লাভজনক বাজারগুলোকে টার্গেট করবে। কারণ এসব জায়গায় পরিবহন খরচ কম এবং মুনাফা বেশি থাকে। অন্যদিকে প্রত্যন্ত বা দুর্গম অঞ্চলগুলোতে পরিবহন খরচ বেশি হওয়ায় সেখানে তারা জ্বালানি সরবরাহ কমিয়ে দিতে পারে, যার ফলে প্রান্তিক অর্থনীতি চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। বিপিসির ভূমিকা যদি এভাবে খর্ব করে দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে যেকোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক জরুরি অবস্থায় সরকারের নিজস্ব মজুত, ডিপো ও নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার যে সক্ষমতা, তা চিরতরে দুর্বল হয়ে পড়বে।
এই অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের ফলে সরকার বিশাল অঙ্কের রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হবে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচটি অর্থবছরে সরকার কেবল বিপিসির মাধ্যমেই প্রায় ৭১ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা রাজস্ব হিসেবে আয় করেছে, যা বছরে গড়ে প্রায় ১৩ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা। বেসরকারি খাত এই জায়গা দখল করলে সরকারের কোষাগারে বড় ধরনের টান পড়বে। অন্যদিকে বিপিসির সক্ষমতা বাড়াতে সরকার ইতিমধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকার যে প্রকল্পগুলো হাতে নিয়েছে, সেগুলোর ভবিষ্যৎও ঘোর অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ প্রকল্প, চট্টগ্রাম-ঢাকা জ্বালানি পাইপলাইন, মহেশখালী থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্প এবং জ্বালানি মজুতের সক্ষমতা ৯০ দিনে উন্নীত করার প্রকল্পসহ আরও আটটি বড় চলমান মেগা প্রজেক্ট বেসরকারি আমদানির কারণে তাদের প্রত্যাশিত সুফল দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হবে।
একাধিক বেসরকারি আমদানিকারক বাজারে প্রবেশ করলে জ্বালানি তেলের মান নিয়ন্ত্রণ বা মনিটরিং করা সরকারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে, যা নিম্নমানের বা ভেজাল তেল সরবরাহের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সম্মানীয় অধ্যাপক বদরুল ইমাম এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, জ্বালানির বাজার বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেওয়া হলে দাম কোনোভাবেই আর সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। এছাড়া বেসরকারি খাতের আগ্রাসনের মুখে পড়ে রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন কোম্পানি যেমন পদ্মা, মেঘনা এবং যমুনা আর্থিকভাবে চরম সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে। তবে বিপিসির ওই কমিটি জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের একেবারেই বিপক্ষে নয়। তারা বলছে, বেসরকারি কোম্পানিগুলো চাইলে অপরিশোধিত তেল আমদানি এবং রিফাইনারি, স্টোরেজ বা পাইপলাইনের মতো বিশাল অবকাঠামো খাতে নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ করতে পারে। কিন্তু পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির মতো স্পর্শকাতর বিষয়টি বেসরকারি হাতে ছেড়ে দিলে তা দেশের জন্য আত্মঘাতী হবে।