শিরোনামঃ
প্রথমবার মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের কথা জানালো যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বিমান ভূপাতিত হওয়ার পর ৫০ ঘণ্টা আত্মগোপনে মার্কিন সেনা পরীক্ষার ভয় এবং মহিউদ্দিন খান স্যার ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে ৬ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১ হাজার ৩১৬ ডেঙ্গুতে একদিনে সাত জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৫৯৩ সাংবাদিকদের ‘যাচাইহীন সংবাদে’ ১০ বছর কারাদণ্ডের প্রস্তাব শিক্ষা, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন ছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্র অসম্ভব: রিজভী সিলেটে শাহজালাল ও শাহপরানের মাজার জিয়ারত রাষ্ট্রপতির হাটহাজারীতে গোলা বিস্ফোরণে শহীদ সেনাসদস্যদের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক সহায়তা ইউপি নির্বাচনের রোডম্যাপ নিয়ে পিছু হটল নির্বাচন কমিশন
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৪ অপরাহ্ন

আট মাসে ৪০০ পরিচয়হীন লাশের নেপথ্যে খুন নাকি গুম? :ঢাকায় মাসে ৫০ বেওয়ারিশ লাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৮ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কোলাহল আর জনারণ্যের এই বিশাল রাজধানী ঢাকা যেন এক নীরব মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রায় প্রতিদিনই উদ্ধার হচ্ছে নাম-পরিচয়হীন মানুষের নিথর দেহ। জীবন ও জীবিকার তাগিদে এই শহরে ছুটে আসা বহু মানুষ দিনশেষে হারিয়ে যাচ্ছে চিরস্থায়ী অন্ধকারের গহ্বরে। প্রিয়জনের খোঁজে মর্গের সামনে অপেক্ষার প্রহর গোনেন অনেকে, কেউ কেউ স্বজনের সন্ধান পেলেও বহু মরদেহ পড়ে থাকে সম্পূর্ণ ‘বেওয়ারিশ’ বা পরিচয়হীন হিসেবে। আধুনিক প্রযুক্তি আর ডিজিটাল বাংলাদেশের এই যুগে এসেও পরিচয় শনাক্ত করতে না পারার এই চিত্র সত্যিই চরম উদ্বেগজনক। পরিচয়হীন এসব লাশের শেষ ঠিকানা হয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে। সংস্থাটির সর্বশেষ পরিসংখ্যান রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো; চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই তারা ৪০০টি বেওয়ারিশ লাশের দাফন ও সৎকার সম্পন্ন করেছে। অর্থাৎ, প্রতি মাসে গড়ে অন্তত ৫০ জন মানুষ এই বিশাল শহরে সম্পূর্ণ পরিচয়হীন অবস্থায় পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিচ্ছেন।
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তথ্যভান্ডার নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করলে এই নির্মম বাস্তবতার আরও গভীর চিত্র ফুটে ওঠে। গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জানুয়ারি মাসে ৩০টি, ফেব্রুয়ারিতে ৫৯টি, মার্চে ৫২টি, এপ্রিলে ৪৬টি, মে মাসে ৫৬টি, জুনে সর্বোচ্চ ৬৭টি, জুলাইয়ে ৪২টি এবং আগস্ট মাসে ৪৮টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করা হয়েছে। এদের মধ্যে ভাগ্যহত ৭৪ জনের মরদেহ দাফন করা হয়েছে জুরাইন কবরস্থানে এবং ৩২৫টি লাশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করা হয়েছে মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার বধ্যভূমি সংলগ্ন কবরস্থানে। এছাড়া পোস্তগোলা শ্মশানঘাটে এক হতভাগ্যের সৎকার সম্পন্ন হয়েছে। বিগত বছরগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, এই সংখ্যা মোটেও নতুন বা আকস্মিক নয়। সংস্থাটি এর আগে ২০২৪ সালে ৫৭০টি এবং ২০২৫ সালে ৬৪৩টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন ও সৎকার করেছিল, যা প্রমাণ করে এই পরিচয়হীন মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘদিনের এক চলমান ট্র্যাজেডি।
তবে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটির দেওয়া এই বিশাল সংখ্যার সঙ্গে কিছুটা বিস্ময় ও দ্বিমত প্রকাশ করেছেন খোদ ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। এত বিপুলসংখ্যক মরদেহ কীভাবে বেওয়ারিশ থাকছে, সে বিষয়ে তাঁর কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো বিস্তারিত তথ্য নেই বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে ডিএমপির মাঠপর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক, রেললাইন, পার্ক, ফুটপাত থেকে শুরু করে নদী, খাল ও ঝিলসহ বিভিন্ন আনাচ-কানাচ থেকে প্রায় প্রতিদিনই পুলিশ এসব অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার করছে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বিভিন্ন বয়সী মানুষের এসব লাশ উদ্ধারের পর নিয়ম অনুযায়ী মর্গে পাঠানো হয়।
উদ্ধার হওয়া প্রতিটি বেওয়ারিশ লাশই যে হত্যাকাণ্ডের শিকার, বিষয়টি পুরোপুরি তেমন নয়। পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক সময় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে যাওয়া কিংবা আকস্মিক অসুস্থতায় রাস্তায় পড়ে থাকা অবস্থায় অনেকের মৃত্যু হয়। এদের একটি বড় অংশ মূলত ভবঘুরে, মানসিক ভারসাম্যহীন, ছিন্নমূল এবং পরিবার থেকে দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন থাকা মানুষ। তাদের সঙ্গে কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন সনদ না থাকায় আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও তাদের পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। ফলে বাধ্য হয়েই আইনি প্রক্রিয়া শেষে দাফনের জন্য তাদের আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করতে হয়। বেঁচে থাকতে যারা সমাজের এক প্রান্তে অবহেলিত জীবন কাটিয়েছে, মৃত্যুর পরও তারা সেই অবহেলার চাদরেই ঢাকা পড়ে যায়।
তবে সবচেয়ে ভয়ংকর ও লোমহর্ষক দিকটি হলো পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। অনেক সময় অপরাধীরা হত্যার পর লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে অত্যন্ত বীভৎসভাবে তা খণ্ডবিখণ্ড ও বিকৃত করে ফেলে। এর ফলে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপসহ পরিচয় শনাক্তকরণের গুরুত্বপূর্ণ সব আলামত সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। প্রযুক্তির এই উৎকর্ষের যুগেও তখন পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে নিহতের পরিচয় বের করতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি আদাবর এলাকার ১০ নম্বর সড়কের শেষ মাথায় একটি খাল থেকে ব্যাগ ও বস্তাবন্দী অবস্থায় অজ্ঞাতনামা এক তরুণীর ছয় টুকরো করা অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বীভৎস এই হত্যাকাণ্ডের পর লাশ পচে যাওয়ায় আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) চৌকস সদস্যরাও উন্নত প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে তার পরিচয় শনাক্ত করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। ঘটনাটি নিয়ে আদাবর থানার ওসি মো. জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, পুলিশ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে এবং পরিচয় জানার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে, তবে লাশটির টুকরোগুলো বর্তমানে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে পড়ে আছে।
অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের এই বিভীষিকাময় মিছিল যেন থামবার নয়। গতকাল সোমবারও সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর শাহবাগ, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী ও কামরাঙ্গীরচর থানা এলাকা থেকে নারীসহ অন্তত পাঁচজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ভবঘুরে প্রকৃতির এই মানুষদের মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পরিচয় না মিললে এদের পরিণতিও হবে সেই বেওয়ারিশ দাফন। এর আগে শনিবার শাহবাগ থানাধীন কদম ফোয়ারা এবং জাতীয় ঈদগাহের প্রধান ফটকের সামনের ফুটপাত থেকে আনুমানিক ৬৫ ও ৪৫ বছর বয়সী দুই অজ্ঞাত পুরুষের মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যারা মূলত অসুস্থতার কারণে মারা গেছেন বলে ধারণা করছে পুলিশ। গত ১২ জুলাইও শাহবাগ এলাকার পৃথক স্থান থেকে তিন ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল, যাদের সবাইকেই পরবর্তীতে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করতে হয়েছে।
পরিচয় শনাক্তের বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার জানিয়েছেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে আঙুলের ছাপ বা অন্য কোনো উপায়ে পরিচয় জানা না গেলে ম্যানুয়াল পদ্ধতি ব্যবহার করে পুলিশ। তবে লাশ অর্ধগলিত হলে বিষয়টি চরম আকার ধারণ করে। তখন আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে লাশের ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করে রাখা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। মর্গে দীর্ঘদিন লাশ ফেলে রাখার মতো পর্যাপ্ত জায়গার তীব্র সংকট থাকায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে দ্রুতই দাফনের ব্যবস্থা করতে হয়। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফনসেবা কর্মকর্তা কামরুল আহমেদও একই কথা জানিয়েছেন। পুলিশের সুরতহাল, ময়নাতদন্ত এবং চূড়ান্ত ক্লিয়ারেন্স ছাড়া তারা কোনো লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে গ্রহণ করেন না।
মানবাধিকার সংগঠন ও কর্মীরা এই বেওয়ারিশ লাশের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মানবাধিকার ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এমএসএফের মতে, বিগত বছরগুলোতে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতপরিচয় লাশগুলোর একটি বিশাল অংশের পরিচয় আজও অজানা রয়ে গেছে। শুধু লাশ উদ্ধার নয়, পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটনের বিশ্লেষণ আরও চাঞ্চল্যকর। তিনি মনে করেন, ঢাকায় বেওয়ারিশ লাশের একটি বড় অংশই মূলত পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার। কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের হার অত্যন্ত নগণ্য এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। অপরাধীরা বুঝতে পারছে যে, লাশ গুম বা বিকৃত করে পরিচয় গোপন করতে পারলেই অনায়াসে পার পাওয়া সম্ভব। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে রাষ্ট্রকে আরও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করে অপরাধীদের কাছে এই কঠোর বার্তা পৌঁছে দিতে হবে যে, হত্যা করে লাশ গুম করলেও কোনোভাবেই পার পাওয়া যাবে না। অন্যথায় নাম না জানা এসব মানুষের লাশের সারি কেবল দীর্ঘই হতে থাকবে।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


এ জাতীয় আরো খবর...