শিরোনামঃ
এশিয়ার মুদ্রাবাজারে দরপতনের হিড়িক: ব্যতিক্রম শুধু টাকার স্থিতিশীলতা সৌদি-হুথি সংঘাত: রেমিট্যান্স, জ্বালানি ও বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ বাড়ছে ঢাকায় তিন কনসার্ট আবাহনীর মাঠের লিজ বাতিল রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচনে ছোট হচ্ছে সফরসঙ্গীর বহর: প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফর সংক্ষিপ্ত, বাতিল সানফ্রান্সিসকো যাত্রা এমপিদের জন্য উন্নয়ন তহবিল ২ কোটি থেকে বেড়ে ৮০ কোটি: বিপুল বরাদ্দে দুর্নীতির পুরোনো শঙ্কা ইলিশের উল্টোরথ: পদ্মার আকাল মেটাতে বেনাপোল দিয়ে ঢুকছে গুজরাটের ইলিশ ধানমন্ডি-গুলশান-বনানীর লেক দ্রুত পরিষ্কারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা বিল পাস ঠাকুরগাঁও-১: বিএনপির মনোনয়ন চান রাষ্ট্রপতির ভাইসহ ৩ নেতা
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৮ অপরাহ্ন

রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচনে ছোট হচ্ছে সফরসঙ্গীর বহর: প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফর সংক্ষিপ্ত, বাতিল সানফ্রান্সিসকো যাত্রা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য ও ঐতিহাসিক কূটনৈতিক মাইলফলক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় চার দশক পর বিশ্বমঞ্চের এই সর্বোচ্চ পর্ষদে সভাপতির গুরুদায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের একজন শীর্ষ কূটনীতিক। ৮১তম এই অধিবেশনের সভাপতির গৌরবময় আসনে অধিষ্ঠিত রয়েছেন বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। একই সঙ্গে এই মর্যাদাপূর্ণ অধিবেশনে সরকারপ্রধান হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে একই সময়ে সাধারণ পরিষদের সভাপতি এবং সরকারপ্রধান হিসেবে বাংলাদেশের এই যুগপৎ ও সরব উপস্থিতি এক ব্যতিক্রমী এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তের জন্ম দিয়েছে। তবে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক সফরের প্রাক্কালে রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচন এবং সময়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিতে প্রধানমন্ত্রীর পূর্বনির্ধারিত সফরসূচিতে ব্যাপক পরিবর্তন ও কাটছাঁট করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের একটি বড় অংশ হিসেবে জাতিসংঘের মূল আনুষ্ঠানিকতা শেষে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সানফ্রান্সিসকোতে যাওয়ার একটি পূর্বপরিকল্পনা ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান না করা এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থের সর্বোচ্চ সাশ্রয় নিশ্চিত করার বৃহত্তর স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী নিজেই তার সেই সফরটি সংক্ষিপ্ত করার দৃঢ় আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এর ফলে তার সানফ্রান্সিসকো যাত্রাটি পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। সরকারপ্রধান হিসেবে গত ফেব্রুয়ারি মাসে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি হতে যাচ্ছে তার দ্বিতীয় বিদেশ সফর। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২১শে সেপ্টেম্বর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে দেশ ত্যাগ করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই পরিবর্তিত ও সংক্ষিপ্ত সফরসূচি মূলত নিউ ইয়র্ক শহরকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে। তবে ওয়াশিংটন ডিসিতেও তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক কর্মসূচি নির্ধারিত রয়েছে। সূচি অনুযায়ী, আগামী ২৩শে সেপ্টেম্বর একটি অত্যন্ত হাই-প্রোফাইল ও সম্মানজনক নৈশভোজে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সম্মানে এই বিশেষ নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প এই জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের অংশগ্রহণে এই আয়োজনটি বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের এক দারুণ সুযোগ তৈরি করবে। এরপর ২৪শে সেপ্টেম্বর বিশ্বনেতাদের সামনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মূল আনুষ্ঠানিকতা শেষে ২৫শে সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত একটি বিশাল নাগরিক সংবর্ধনায় তার অংশগ্রহণ করার কথা রয়েছে। এই পুরো সফরে প্রধানমন্ত্রীর সার্বক্ষণিক সফরসঙ্গী হিসেবে তার পাশে থাকবেন বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি জুবাইদা রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর বাতিল হওয়া সানফ্রান্সিসকো সফরের রূপরেখাটি বেশ বিস্তৃত ছিল। সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয়োজনে বেশ কয়েকটি বড় অনুষ্ঠানে তার যোগ দেওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি সিলিকন ভ্যালিকেন্দ্রিক প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও তার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল, যা দেশের প্রযুক্তি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হতে পারত। কিন্তু সফরসূচি সংক্ষিপ্ত করার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে এই কর্মসূচিগুলো আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। সরকারের শীর্ষ মহল মনে করছে, বর্তমান রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থানের চেয়ে দেশে সময় দেওয়া এবং সরকারি অর্থের অপচয় রোধ করাটাই বেশি জরুরি।
সফরসূচি সংক্ষিপ্ত করার পাশাপাশি এবারের জাতিসংঘ সফরে সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীর আকার। অতীত সরকারগুলোর শাসনামলে জাতিসংঘ বা যেকোনো বিদেশ সফরে বিশাল ও অপ্রয়োজনীয় বহর নিয়ে যাওয়ার যে দীর্ঘদিনের অপসংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সরকার সেই প্রথা ভাঙতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, এবারের সফরে প্রধানমন্ত্রীর মূল বহরে ৩০ জনেরও কম সদস্য থাকবেন। রাষ্ট্রীয় অর্থের চরম অপচয় কমানো এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিদের নিয়ে অযথা সময় ব্যয় এড়াতেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা বিধান এবং অত্যাবশ্যকীয় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য যাদের উপস্থিতি একান্তই অপরিহার্য, কেবল তাদের নামই এই সংক্ষিপ্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
অতীতের পরিসংখ্যান ঘাটলে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় খরচে বিশাল বহর নিয়ে বিদেশ ভ্রমণের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা ছিল। ২০১৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন নিউ ইয়র্কে গিয়েছিলেন, তখন তার সঙ্গে সফরসঙ্গী ছিলেন ১৮০ জন। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের অধিবেশনে সেই বহরের আকার আরও ফুলেফেঁপে ২৯২ জনে গিয়ে ঠেকেছিল, যা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। এমনকি ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ৭৯তম অধিবেশনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সফরসঙ্গীর আনুষ্ঠানিক সংখ্যা পুস্তিকা অনুযায়ী ৫৭ জন হলেও, সরকারি বিভিন্ন নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায় সেই সংখ্যা বাস্তবে ৮০ জনেরও বেশি ছিল। সেই অসংগতির জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক নতুন ও মিতব্যয়ী দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চলেছেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, কারা এই সংক্ষিপ্ত বহরে থাকবেন এবং কতদিন অবস্থান করবেন, তা চূড়ান্ত হওয়ার পরই পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২৬শে সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী দেশে প্রত্যাবর্তন করবেন।
জাতিসংঘের এই সর্বোচ্চ মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত দিকনির্দেশনামূলক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, এবারের ভাষণে মূলত তার নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের ভবিষ্যৎ রূপরেখা, লক্ষ্য এবং আকাঙ্ক্ষার কথাগুলোই বিশ্বনেতাদের সামনে অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরা হবে। একটি সফল গণতান্ত্রিক উত্তরণের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা নতুন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন এদেশের মানুষ দেখছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে স্পষ্ট করা হবে। এর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা, চলমান সংঘাতগুলোর একটি টেকসই ও স্থায়ী সমাধান এবং উদীয়মান বৈশ্বিক সংকটগুলো মোকাবিলায় বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট অবস্থান তুলে ধরবেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আরও যে বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে তার মধ্যে অন্যতম হলো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলায় বৈশ্বিক পদক্ষেপ। বিশেষ করে জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্ব যাতে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে, সে বিষয়ে বাংলাদেশের জোরালো ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং আগামী দিনের অপার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার একটি চিত্র তুলে ধরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা থাকবে তার বক্তব্যে। স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সাধারণ মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা এবং সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণে সরকারের যে ভবিষ্যৎ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে, তা জাতিসংঘের মঞ্চে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হবে। বর্তমানের চরম অস্থির বৈশ্বিক বাস্তবতায় শান্তি, পারস্পরিক স্থিতিশীলতা এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেবেন।
সবশেষে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গা সংকট এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবেই বিবেচিত হবে। মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গার নিরাপদ, সম্মানজনক এবং টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর, বাস্তবমুখী এবং দৃশ্যমান সহযোগিতা জোরালোভাবে চাইবে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির নিশ্চিত করেছেন যে, শুধু মূল ভাষণেই নয়, বরং জাতিসংঘ অধিবেশনের সাইডলাইনেও রোহিঙ্গা ইস্যুর দ্রুত সমাধানে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে একাধিক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠকের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: মানব জমিন


এ জাতীয় আরো খবর...