গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর পর থেকেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত দলটির নেতাকর্মীরা জনরোষের ভয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। তবে আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর কথিত প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে হঠাৎ করেই নতুন করে উত্তাপ ও চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে চরমভাবে বিব্রত ও অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে বিদেশে বসে নাশকতার সুদূরপ্রসারী ছক তৈরি করা হচ্ছে। আর এই ভয়ংকর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মূল দায়িত্বে রয়েছে খোদ পুলিশের মাঠপর্যায়ের একটি অংশ এবং দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পালিয়ে এসে রাজধানীতে আত্মগোপনে থাকা দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। পরিস্থিতি ঘোলাটে করার কৌশল হিসেবে নিষিদ্ধ এই সংগঠনটি সম্প্রতি ‘ঢাকা লকডাউন’-এর মতো কর্মসূচিরও ডাক দিয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, ৫ আগস্টের আকস্মিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে হাজার হাজার আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের মাঝারি ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী প্রাণভয়ে রাজধানীতে এসে আত্মগোপন করেছেন। ঢাকার বিশাল আয়তন ও ঘনবসতির পুরোপুরি সুযোগ নিয়ে তারা সাধারণ আবাসিক এলাকা, ব্যাচেলর মেস, সস্তা আবাসিক হোটেল এবং আত্মীয়স্বজনদের বাসাবাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। এদের অনেকের বিরুদ্ধেই গুরুতর অপরাধের মামলা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা নজরদারি এড়াতে তারা অত্যন্ত সুকৌশলে হকার, চাকরিপ্রার্থী বা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ছদ্মবেশ ধারণ করেছেন। ঢাকার মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা, খিলগাঁও, মুগদা, শাহজাহানপুর, সবুজবাগ, ধানমণ্ডি, যাত্রাবাড়ি এবং পুরান ঢাকার সূত্রাপুর-কোতোয়ালি এলাকার মতো জনবহুল এলাকার কিছু মেস ও ফ্ল্যাট বাড়িতে এদের নিয়মিত যাতায়াত এবং গোপন বৈঠকের সুনির্দিষ্ট খবর পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মূলত ঢাকার বাইরে আত্মগোপন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়াতেই তারা রাজধানীকে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, রাজধানীতে বাস্তবায়িত হওয়া এই নাশকতার মূল ছক, সার্বিক দিকনির্দেশনা ও বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন আসছে দেশের বাইরে থেকে। ভারত, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পালিয়ে থাকা বিগত সরকারের সুবিধাভোগী ধনাঢ্য ব্যক্তি, সাবেক এমপি এবং প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতারাই এর নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন। তারা সিগন্যাল, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড অ্যাপস ব্যবহার করে অত্যন্ত গোপনে দেশে থাকা কর্মীদের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিচ্ছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজপথে বড় ধরনের কোনো সমাবেশ করার সাংগঠনিক শক্তি বা বিন্দুমাত্র জনসমর্থন তাদের নেই, তাই তারা ‘হিট অ্যান্ড রান’ বা আকস্মিক ঝটিকা মিছিলের চোরাগোপ্তা কৌশল গ্রহণ করেছেন। তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো হঠাৎ করে ৩০-৪০ জনের একটি ছোট দল নিয়ে রাস্তায় নেমে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো, ব্যানারসহ ছবি বা ভিডিও ধারণ করা এবং তা মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের একটি কৃত্রিম উপস্থিতির জানান দেওয়া। এই নাশকতামূলক কার্যক্রম সচল রাখতে বিদেশে পলাতক সাবেক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা ও নেতারা প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ কালো অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন।
এই পুরো নাশকতার প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হলো ফ্যাসিস্ট আমলের সুবিধাভোগী এবং বর্তমানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত একশ্রেণির পুলিশ কর্মকর্তার সরাসরি ইন্ধন ও সম্পৃক্ততা। সম্প্রতি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ক্যান্টনমেন্ট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রাকিবুল হাসানের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর পুলিশের মাঠপর্যায়ের এই ভয়ংকর নীলনকশা জনসমক্ষে ফাঁস হয়ে যায়। ভাইরাল হওয়া ওই অডিওতে ওসি রাকিবুলকে সুস্পষ্টভাবে বলতে শোনা যায় যে, ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা দেশে ফিরছেন এবং বর্তমান রাস্তার পুলিশ অত্যন্ত দুর্বল হওয়ায় তারা তখন কিছুই করতে পারবে না। তিনি পুলিশ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে মন্তব্য করে বলেন যে সিনিয়র অফিসাররা বিএনপির রাজনীতি করছেন। পাশাপাশি আইজিপির গাড়িচালকের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সারা দেশে ওসি বদলির মতো অত্যন্ত বিস্ফোরক ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগও তিনি আনেন। এই অডিও ভাইরালের পর তাকে থানা থেকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে কঠোর জেরা করা হয়। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটির ফরেনসিক পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, ডিসেম্বর মাসকে কেন্দ্র করে পুলিশের মাঠপর্যায়ের অনেক সদস্যের সাথে তার সন্দেহজনক কথোপকথন হয়েছে এবং তারা শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে একটি সংঘবদ্ধ নীলনকশা তৈরি করেছেন।
বিগত ফ্যাসিবাদের দীর্ঘ সময়ে পুলিশের ভেতরে সুবিধাভোগী এমন কিছু বিতর্কিত কর্মকর্তা বৈষম্যের শিকার হওয়ার বানোয়াট দাবি করে বর্তমান সরকারেও অত্যন্ত কৌশলে ভালো পদ বাগিয়ে নিয়েছেন বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তারা এখন প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে থেকেই অত্যন্ত চতুরতার সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় রাখার চেষ্টা করছেন এবং পলাতক চক্রটিকে নিয়মিত অপারেশনাল তথ্য সরবরাহ করে সাহায্য করছেন। সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক তদন্তে ইতিমধ্যে প্রায় আড়াই শ’ সক্রিয় পুলিশ সদস্যের সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, যারা এখনো পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত আছেন। তারা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ চক্রের সদস্য এবং তারা চাকরিচ্যুত বা পলাতক সাবেক প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন ও স্পর্শকাতর তথ্য পাচার করছেন। গোয়েন্দা তথ্য মতে, এসব পলাতক ও ইন্ধনদাতা কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিবির সাবেক প্রধান হারুন অর রশীদ, সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার এবং পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। এসব সন্দেহভাজন কর্মকর্তার গতিবিধি ও কর্মকাণ্ড এখন অত্যন্ত কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে পুলিশের এই ম্যানেজ হওয়া বা সন্দেহজনক নিষ্ক্রিয়তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশানের মতো অত্যন্ত সুরক্ষিত কূটনৈতিক ও অভিজাত এলাকায়। সেদিন জুমার নামাজের ঠিক আগে হঠাৎ করেই নিষিদ্ধ সংগঠনের একটি ঝটিকা মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণ ও গাড়ি পোড়ানোর মতো মারাত্মক নাশকতার ঘটনা ঘটে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে চরমভাবে নাড়িয়ে দেয়। এত কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে কীভাবে এমন দুঃসাহসিক ঘটনা ঘটলো, তা নিয়ে খোদ সরকারের উচ্চপর্যায়ে তীব্র অসন্তোষ ও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মাঠপর্যায়ের পুলিশকে ম্যানেজ করেই মূলত ওই ঝটিকা মিছিল করা হয়েছিল। চেইন অব কমান্ডের এই চরম ও অমার্জনীয় ব্যর্থতার দায়ে গুলশান বিভাগের আলোচিত উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) তানভীর, গুলশান থানার ওসি এবং গতকাল গুলশান জোনের এডিসিকে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। গুলশানের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত ১৭৯ জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। ডিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, গ্রেপ্তারকৃতদের মোবাইল কললিস্ট এবং অর্থের লেনদেন বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে এবং পুলিশ তাদের পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
সার্বিক এই অস্থিতিশীল ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে এক নজিরবিহীন ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, রাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানে যাওয়া ওসি রাকিবুলের বিরুদ্ধে যথাযথ বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও জানান, পুলিশের সাইবার ইউনিটগুলো পুরোদমে কাজ করছে এবং যারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গিয়ে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড করবে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) নিয়াজ মেহেদী এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছেন, নগরবাসীর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, ফ্লাইওভার এবং প্রধান প্রধান প্রবেশদ্বারগুলোতে (যেমন- গাবতলী, সায়েদাবাদ, আব্দুল্লাহপুর, বাবুবাজার ব্রিজ) বিশেষ চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। এসব চেকপোস্ট ও কূটনৈতিক এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) মোতায়েন করা হয়েছে। বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে সন্দেহজনক মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনে নিবিড় তল্লাশি চালানো হচ্ছে এবং নগরজুড়ে থানা মোবাইল পেট্রোল, ফুট পেট্রোল ও হোন্ডা পেট্রোলের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। যেকোনো নাশকতা প্রতিরোধে মাঠে ডিবি টিম, সিটিটিসি টিম ও এপিবিএন টিম সার্বক্ষণিক সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এর পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) রাজধানীর গুলশান, বনানী, তিন শ’ ফিট এবং আগারগাঁওয়ের মতো এলাকাগুলোতে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিশেষ করে রাত বাড়ার সাথে সাথে ঢাকার বিভিন্ন সন্দেহভাজন ব্যাচেলর মেস ও সস্তা হোটেলগুলোতে পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে আকস্মিক ‘ব্লক রেইড’ বা চিরুনি অভিযান চালাচ্ছে। এসব মেসে অবস্থানরত বহিরাগতদের বৈধ পরিচয়পত্র বা ঢাকায় অবস্থানের যৌক্তিক কারণ দেখাতে ব্যর্থ হলে তাদের কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করা হচ্ছে।