শিরোনামঃ
অতিরিক্ত বাসভাড়া নিলে জরিমানা, বাতিল হবে রুট পারমিট: সড়ক পরিবহনমন্ত্রী সরকারি হাসপাতালের সামনে কোনো ক্লিনিকের অনুমোদন দেওয়া হবে না বিরোধী দলগুলো আত্মস্বীকৃত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে: রিজভী দূরপাল্লা ও মহানগরে বাসভাড়া বাড়ল নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনার পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম সীমিত সম্পদের ভারসাম্য রক্ষায় জ্বালানি খাতে ভর্তুকি সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত : তথ্য উপদেষ্টা বাস্তবসম্মত ও কর্মমুখী শিক্ষা প্রদানে বিশেষ জোর দেওয়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির বিমার টাকা হাতাতে নিজেদের বাসেই আগুন দিচ্ছে আওয়ামী লীগ চক্র চাকরির চূড়া থেকে নামার প্রস্তুতি ফিফা সংস্কারের প্রস্তাব ইনফান্তিনোর
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪২ পূর্বাহ্ন

দূরপাল্লা ও মহানগরে বাসভাড়া বাড়ল

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশে জ্বালানি তেলের দাম নতুন করে অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধির পরপরই গণপরিবহণের ভাড়ায় এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব এসে পড়েছে| দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনা এবং পরিবহন খাতের নেতাদের সঙ্গে সরকারের দফায় দফায় আলোচনার পর দূরপাল্লার বাস এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা করে বাড়ানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে| মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পরিবহন মালিক সমিতির শীর্ষ নেতা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই ভাড়াবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়| নতুন এই সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে| অন্যদিকে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা করা হয়েছে| জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন মালিকরা যে লোকসানের আশঙ্কা করছিলেন, তা মেটাতেই মূলত এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে| তবে সাধারণ যাত্রীদের মতে, এই ভাড়াবৃদ্ধি তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে|
পরিবহন মালিকদের সঙ্গে মঙ্গলবারের এই চূড়ান্ত বৈঠকের আগে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ভাড়াবৃদ্ধির একটি প্রাথমিক খসড়া প্রস্তাব তৈরি করেছিল| গত সোমবার বিআরটিএ-এর পক্ষ থেকে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং নগর পরিবহনে ১৮ পয়সা বাড়ানোর একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পেশ করা হয়েছিল| পরিবহন মালিকরা প্রথম থেকেই আরও বেশি হারে ভাড়া বাড়ানোর জন্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আসছিলেন| তাদের যুক্তি ছিল, শুধু জ্বালানি তেল নয়, বরং বাসের যন্ত্রাংশ, টায়ার, লুব্রিকেন্ট এবং কর্মচারীদের বেতনও বৃদ্ধি পেয়েছে| তবে সরকার সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপের বিষয়টি বিবেচনা করে বিআরটিএ-এর প্রস্তাবিত হারের চেয়ে কিছুটা কমিয়ে উভয় ক্ষেত্রেই কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তে উপনীত হয়| যদিও পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, কাগজে-কলমে এই ১৭ পয়সা বৃদ্ধির কথা বলা হলেও বাস্তবে যাত্রীদের কাছ থেকে রাউন্ড ফিগারের নামে এর চেয়ে অনেক বেশি অর্থ আদায় করা হতে পারে|
এই ভাড়াবৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন সচিবালয়ে উপস্থিত থাকা পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস| মঙ্গলবার বৈঠক শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি দৃঢ় প্রত্যাশা ব্যক্ত করে জানান যে, আজই এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে| শিমুল বিশ্বাস অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে আরও উল্লেখ করেন, সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই গত কয়েক দিন ধরে যেসব পরিবহন মালিক ও শ্রমিক যাত্রীদের কাছ থেকে বেআইনিভাবে বাড়তি ভাড়া আদায় করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পরিবহন মালিক সমিতিকে সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে| শুধু সাংগঠনিক ব্যবস্থাই নয়, বরং প্রশাসনিকভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে এসব অসাধু পরিবহনকর্মীর বিরুদ্ধে জরিমানাসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি গণমাধ্যমকে আশ্বস্ত করেন|
গণপরিবহণের ভাড়াবৃদ্ধির এই ঘটনা দেশে এবারই প্রথম নয়, বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে| এর আগে গত এপ্রিলে যখন আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে ডিজেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছিল, তখনও বাস ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল| ওই সর্বশেষ বৃদ্ধির পর ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে বড় বাসের ভাড়া ছিল কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৫৩ পয়সা এবং মিনিবাসের ভাড়া নির্ধারিত ছিল ২ টাকা ৪২ পয়সা| মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে পুনরায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং তার প্রভাবে বাসভাড়া বৃদ্ধির এই ঘটনা সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের পারিবারিক বাজেটকে সম্পূর্ণ তছনছ করে দিয়েছে| নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দামের মধ্যে যাতায়াত ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী এবং দিনমজুররা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন|
দূরপাল্লার বাসের ভাড়ার ক্ষেত্রে হিসাব-নিকাশ আরও কিছুটা জটিল ও যাত্রীদের জন্য আর্থিকভাবে ক্ষতিকর| বিআরটিএ-এর হিসাব অনুযায়ী দূরপাল্লার ৫২ আসনের বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ২৩ পয়সা নির্ধারিত ছিল, যা এখন ২ টাকা ৪০ পয়সা হলো| কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন| দেশের মহাসড়কগুলোতে চলাচলকারী বেশিরভাগ দূরপাল্লার নন-এসি বাসে যাত্রীদের আরামের কথা বলে আসনসংখ্যা কমিয়ে ৪০ বা তারও কম করা হয়ে থাকে| বাস মালিকদের দাবি, আসনসংখ্যা কম থাকার কারণে ৫২ আসনের হিসাব অনুযায়ী ভাড়া নিলে তাদের লোকসান হয়| ফলে এসব বাসে যাত্রীপ্রতি মূল ভাড়া বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি পড়ে| এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিভিন্ন মহাসড়কের টোল, বঙ্গবন্ধু সেতু বা পদ্মা সেতুর মতো বড় বড় সেতুর টোলের খরচ| এই সমস্ত টোলের টাকা সরাসরি যাত্রীদের টিকিটের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত করে আদায় করা হয়| ফলে কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হলেও, টোল ও আসনসংখ্যার গ্যাঁড়াকলে পড়ে একজন যাত্রীকে টিকিটপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি গুনতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে|
রাজধানী ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় এই ভাড়াবৃদ্ধি এক নতুন নৈরাজ্যের জন্ম দিতে পারে বলে মনে করছেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির নেতারা| ঢাকা শহরে কিলোমিটার হিসাবে ভাড়া নির্ধারণ করা হলেও বাসের কন্ডাক্টররা কখনোই সেই নিয়ম মানেন না| তারা নিজস্ব ‘ওয়েবিল’ বা ‘চেকার’ ব্যবস্থার মাধ্যমে যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করে থাকেন| এক স্টপেজ থেকে অন্য স্টপেজে গেলেই কিলোমিটারের তোয়াক্কা না করে সরাসরি ৫ বা ১০ টাকা বাড়িয়ে নেওয়া হয়| নতুন এই ১৭ পয়সা বৃদ্ধির ঘোষণাকে পুঁজি করে নগর পরিবহনের বাসগুলো ওয়েবেলের নামে যাত্রীদের পকেট আরও নির্মমভাবে কাটবে বলে সাধারণ যাত্রীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন| প্রায় প্রতিদিনই বাসের হেলপারদের সঙ্গে অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের হাতাহাতি ও বচসার ঘটনা ঘটছে, যা আগামী দিনগুলোতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে|
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন যে, গণপরিবহণের এই ভাড়াবৃদ্ধির প্রভাব শুধু যাত্রীদের যাতায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না| পরিবহন ব্যয় বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই পণ্য পরিবহনের খরচও বৃদ্ধি পাবে| এর ফলে কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার উৎপাদিত পণ্য—সবকিছুর দাম আরেক দফা বেড়ে যাওয়ার প্রবল শঙ্কা রয়েছে| একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রে গণপরিবহন খাতকে পুরোপুরি বেসরকারি মালিকদের খেয়ালখুশির ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না| সরকারকে অবশ্যই রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি-এর বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি করে সাধারণ মানুষকে একটি বিকল্প ও সাশ্রয়ী যাতায়াত ব্যবস্থা উপহার দিতে হবে| একই সঙ্গে ভাড়াবৃদ্ধির নামে পরিবহন খাতে যে নৈরাজ্য ও চাঁদাবাজি চলে, তা বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিআরটিএ-এর ভ্রাম্যমাণ আদালতকে সারা বছর রাজপথে সক্রিয় থাকতে হবে| সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সরকার শুধু প্রজ্ঞাপন জারি করেই দায় সারবে না, বরং নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে এক পয়সাও যেন বেশি নেওয়া না হয়, তা নিশ্চিত করতে রাজপথে কঠোর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করবে|


এ জাতীয় আরো খবর...