দেশে জ্বালানি তেলের দাম নতুন করে অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধির পরপরই গণপরিবহণের ভাড়ায় এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব এসে পড়েছে| দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনা এবং পরিবহন খাতের নেতাদের সঙ্গে সরকারের দফায় দফায় আলোচনার পর দূরপাল্লার বাস এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা করে বাড়ানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে| মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পরিবহন মালিক সমিতির শীর্ষ নেতা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই ভাড়াবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়| নতুন এই সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে| অন্যদিকে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা করা হয়েছে| জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন মালিকরা যে লোকসানের আশঙ্কা করছিলেন, তা মেটাতেই মূলত এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে| তবে সাধারণ যাত্রীদের মতে, এই ভাড়াবৃদ্ধি তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে|
পরিবহন মালিকদের সঙ্গে মঙ্গলবারের এই চূড়ান্ত বৈঠকের আগে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ভাড়াবৃদ্ধির একটি প্রাথমিক খসড়া প্রস্তাব তৈরি করেছিল| গত সোমবার বিআরটিএ-এর পক্ষ থেকে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং নগর পরিবহনে ১৮ পয়সা বাড়ানোর একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পেশ করা হয়েছিল| পরিবহন মালিকরা প্রথম থেকেই আরও বেশি হারে ভাড়া বাড়ানোর জন্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আসছিলেন| তাদের যুক্তি ছিল, শুধু জ্বালানি তেল নয়, বরং বাসের যন্ত্রাংশ, টায়ার, লুব্রিকেন্ট এবং কর্মচারীদের বেতনও বৃদ্ধি পেয়েছে| তবে সরকার সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপের বিষয়টি বিবেচনা করে বিআরটিএ-এর প্রস্তাবিত হারের চেয়ে কিছুটা কমিয়ে উভয় ক্ষেত্রেই কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তে উপনীত হয়| যদিও পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, কাগজে-কলমে এই ১৭ পয়সা বৃদ্ধির কথা বলা হলেও বাস্তবে যাত্রীদের কাছ থেকে রাউন্ড ফিগারের নামে এর চেয়ে অনেক বেশি অর্থ আদায় করা হতে পারে|
এই ভাড়াবৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন সচিবালয়ে উপস্থিত থাকা পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস| মঙ্গলবার বৈঠক শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি দৃঢ় প্রত্যাশা ব্যক্ত করে জানান যে, আজই এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে| শিমুল বিশ্বাস অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে আরও উল্লেখ করেন, সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই গত কয়েক দিন ধরে যেসব পরিবহন মালিক ও শ্রমিক যাত্রীদের কাছ থেকে বেআইনিভাবে বাড়তি ভাড়া আদায় করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পরিবহন মালিক সমিতিকে সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে| শুধু সাংগঠনিক ব্যবস্থাই নয়, বরং প্রশাসনিকভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে এসব অসাধু পরিবহনকর্মীর বিরুদ্ধে জরিমানাসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি গণমাধ্যমকে আশ্বস্ত করেন|
গণপরিবহণের ভাড়াবৃদ্ধির এই ঘটনা দেশে এবারই প্রথম নয়, বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে| এর আগে গত এপ্রিলে যখন আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে ডিজেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছিল, তখনও বাস ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল| ওই সর্বশেষ বৃদ্ধির পর ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে বড় বাসের ভাড়া ছিল কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৫৩ পয়সা এবং মিনিবাসের ভাড়া নির্ধারিত ছিল ২ টাকা ৪২ পয়সা| মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে পুনরায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং তার প্রভাবে বাসভাড়া বৃদ্ধির এই ঘটনা সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের পারিবারিক বাজেটকে সম্পূর্ণ তছনছ করে দিয়েছে| নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দামের মধ্যে যাতায়াত ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী এবং দিনমজুররা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন|
দূরপাল্লার বাসের ভাড়ার ক্ষেত্রে হিসাব-নিকাশ আরও কিছুটা জটিল ও যাত্রীদের জন্য আর্থিকভাবে ক্ষতিকর| বিআরটিএ-এর হিসাব অনুযায়ী দূরপাল্লার ৫২ আসনের বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ২৩ পয়সা নির্ধারিত ছিল, যা এখন ২ টাকা ৪০ পয়সা হলো| কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন| দেশের মহাসড়কগুলোতে চলাচলকারী বেশিরভাগ দূরপাল্লার নন-এসি বাসে যাত্রীদের আরামের কথা বলে আসনসংখ্যা কমিয়ে ৪০ বা তারও কম করা হয়ে থাকে| বাস মালিকদের দাবি, আসনসংখ্যা কম থাকার কারণে ৫২ আসনের হিসাব অনুযায়ী ভাড়া নিলে তাদের লোকসান হয়| ফলে এসব বাসে যাত্রীপ্রতি মূল ভাড়া বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি পড়ে| এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিভিন্ন মহাসড়কের টোল, বঙ্গবন্ধু সেতু বা পদ্মা সেতুর মতো বড় বড় সেতুর টোলের খরচ| এই সমস্ত টোলের টাকা সরাসরি যাত্রীদের টিকিটের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত করে আদায় করা হয়| ফলে কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হলেও, টোল ও আসনসংখ্যার গ্যাঁড়াকলে পড়ে একজন যাত্রীকে টিকিটপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি গুনতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে|
রাজধানী ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় এই ভাড়াবৃদ্ধি এক নতুন নৈরাজ্যের জন্ম দিতে পারে বলে মনে করছেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির নেতারা| ঢাকা শহরে কিলোমিটার হিসাবে ভাড়া নির্ধারণ করা হলেও বাসের কন্ডাক্টররা কখনোই সেই নিয়ম মানেন না| তারা নিজস্ব ‘ওয়েবিল’ বা ‘চেকার’ ব্যবস্থার মাধ্যমে যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করে থাকেন| এক স্টপেজ থেকে অন্য স্টপেজে গেলেই কিলোমিটারের তোয়াক্কা না করে সরাসরি ৫ বা ১০ টাকা বাড়িয়ে নেওয়া হয়| নতুন এই ১৭ পয়সা বৃদ্ধির ঘোষণাকে পুঁজি করে নগর পরিবহনের বাসগুলো ওয়েবেলের নামে যাত্রীদের পকেট আরও নির্মমভাবে কাটবে বলে সাধারণ যাত্রীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন| প্রায় প্রতিদিনই বাসের হেলপারদের সঙ্গে অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের হাতাহাতি ও বচসার ঘটনা ঘটছে, যা আগামী দিনগুলোতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে|
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন যে, গণপরিবহণের এই ভাড়াবৃদ্ধির প্রভাব শুধু যাত্রীদের যাতায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না| পরিবহন ব্যয় বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই পণ্য পরিবহনের খরচও বৃদ্ধি পাবে| এর ফলে কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার উৎপাদিত পণ্য—সবকিছুর দাম আরেক দফা বেড়ে যাওয়ার প্রবল শঙ্কা রয়েছে| একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রে গণপরিবহন খাতকে পুরোপুরি বেসরকারি মালিকদের খেয়ালখুশির ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না| সরকারকে অবশ্যই রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি-এর বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি করে সাধারণ মানুষকে একটি বিকল্প ও সাশ্রয়ী যাতায়াত ব্যবস্থা উপহার দিতে হবে| একই সঙ্গে ভাড়াবৃদ্ধির নামে পরিবহন খাতে যে নৈরাজ্য ও চাঁদাবাজি চলে, তা বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিআরটিএ-এর ভ্রাম্যমাণ আদালতকে সারা বছর রাজপথে সক্রিয় থাকতে হবে| সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সরকার শুধু প্রজ্ঞাপন জারি করেই দায় সারবে না, বরং নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে এক পয়সাও যেন বেশি নেওয়া না হয়, তা নিশ্চিত করতে রাজপথে কঠোর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করবে|