বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে এক অভূতপূর্ব ও গভীর বৈপরীত্যের চিত্র আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং প্রবাসী আয়ের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূচকে ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ঠিক তেমনি অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহের কাঠামো এবং বিদেশের শ্রমবাজারে তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ নতুন এক গভীর উদ্বেগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান ও তথ্য-উপাত্ত অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, গত এক বছরের ব্যবধানে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে মোট মুদ্রা সরবরাহ বা ব্রড মানি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, ব্যাংকিং খাতে অর্থের এই বিপুল সরবরাহ বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এর ঠিক বিপরীতে সরকারি খাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থের পরিমাণ বাড়লেও সেই অর্থের বড় অংশ আসলে উৎপাদনশীল বেসরকারি বিনিয়োগে কতটা যাচ্ছে, তা নিয়ে দেশের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মনে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, গত আগস্ট মাসে রপ্তানির তুলনায় আমদানির প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি দ্রুতগতিতে হয়েছে। অন্যদিকে, রেমিট্যান্স প্রবাহ বর্তমানে শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও গত জুলাই-আগস্ট মাসে বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়া মানুষের সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে। সামগ্রিক এই পরিস্থিতি বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহের বর্তমান শক্ত অবস্থানকে দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই রাখতে পারবে, সেটিও এখন জাতীয় অর্থনীতিতে এক বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুদ্রা সরবরাহের বিস্তারিত পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় যে, এক বছরের ব্যবধানে দেশের মুদ্রা সরবরাহ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাস শেষে দেশে ব্রড মানি বা এম২-এর মোট পরিমাণ গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ লাখ ২২ হাজার ৯৪৫ কোটি ৫০ লাখ টাকায়। যদি আমরা মাসিক হিসাবের দিকে তাকাই, তবে দেখা যাবে যে জুনের তুলনায় জুলাই মাসে এটি বেড়েছে ৬ হাজার ৬৫৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যা শতকরা হিসাবে শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ। এর ঠিক আগের মাসে, অর্থাৎ জুনে মাসিক প্রবৃদ্ধির এই হার ছিল ১ দশমিক ০৫ শতাংশ। তবে অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনটি দেখা যাচ্ছে বার্ষিক বা বছরওয়ারি হিসাবের ক্ষেত্রে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসের তুলনায় ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ব্রড মানি বা এম২ বেড়েছে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৪৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যার শতকরা হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। অথচ এর আগের বছরের ঠিক একই সময়ে এই বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেশে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে এবং বেশ দ্রুতগতিতে বেড়েছে। অর্থনীতিবিদরা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, মুদ্রা সরবরাহের এই বিশাল বৃদ্ধির পেছনে মূলত দুটি প্রধান উপাদান সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে। প্রথমত, এক বছরে নিট অভ্যন্তরীণ সম্পদ বা নেট ডমেস্টিক অ্যাসেট বৃদ্ধি পেয়েছে ১০ দশমিক ০৪ শতাংশ। দ্বিতীয়ত, নিট বৈদেশিক সম্পদ বা নেট ফরেন অ্যাসেট বৃদ্ধি পেয়েছে ২২ দশমিক ১২ শতাংশ। সুতরাং এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, দেশের সার্বিক মুদ্রা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ঋণ এবং বৈদেশিক সম্পদ—এই উভয় দিকের সূচকগুলোরই প্রত্যক্ষ ও জোরালো ভূমিকা রয়েছে।
অর্থনীতির এই সার্বিক চিত্রের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্বেগজনক বৈপরীত্যটি দেখা যাচ্ছে অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহের ক্ষেত্রে। জুলাই মাস শেষে দেশের মোট দেশীয় ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৮ কোটি ৬০ লাখ টাকায়। জুন মাসের তুলনায় মাত্র এক মাসের ব্যবধানে এই ঋণ বেড়েছে ১২ হাজার ৭৪৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যা শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ। এক বছর আগে ঠিক একই সময়ে এই দেশীয় ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ, যা এবার এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশে। কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট ঋণের এই বিপুল বৃদ্ধির ভেতরের চিত্রটি বেসরকারি খাতের জন্য তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত দুর্বল ও হতাশাজনক। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে হিসাব করে দেখা যায়, গত এক বছরে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৮০ হাজার ৪৬৭ কোটি ২০ লাখ টাকা, যার প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। অথচ ঠিক আগের বছরের একই সময়ে বেসরকারি খাতে এই ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ। অর্থাৎ, বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১ দশমিক ৯ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে গেছে। এর সম্পূর্ণ অন্য দিকে সরকারি খাতে নিট ঋণ নেওয়ার পরিমাণ এক বছরে বিস্ময়করভাবে বেড়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার ৯০৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা শতকরা হিসাবে ৩৪ দশমিক ১১ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ে সরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির এই হার ছিল মাত্র ১৪ দশমিক ৫১ শতাংশ। এর অর্থ হলো, গত এক বছরে সরকারি ঋণ বৃদ্ধির গতি আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও অনেক বেশি হয়েছে। ঠিক এখানেই দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক প্রশ্নটি সামনে এসে দাঁড়ায়। ব্যাংকিং ব্যবস্থার কাছে থাকা ঋণযোগ্য অর্থের সিংহভাগই যদি ক্রমবর্ধমানভাবে সরকারের বিশাল বাজেট ঘাটতি মেটানো ও অর্থায়নের কাজে ব্যবহৃত হয়ে যায়, তাহলে বেসরকারি খাতে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় ঋণপ্রবাহ আসলে কতটা বাড়ানো সম্ভব হবে? বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য সরাসরি বা লিখিতভাবে এমন কোনো সিদ্ধান্ত দেয় না যে, সরকারি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়াই বেসরকারি খাতের ঋণ কমে যাওয়ার একমাত্র বা প্রধান কারণ। তবে ঠিক একই সময়ে সরকারি ঋণের এমন রকেট গতির বৃদ্ধি এবং বেসরকারি ঋণের চরম মন্থরতা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ঋণের সুষম বণ্টন নিয়ে এক বিশাল কাঠামোগত প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দেয়।
মুদ্রা সরবরাহ ও ঋণপ্রবাহের এই জটিল সমীকরণের মধ্যে আরও একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা গেছে রিজার্ভ মানির ক্ষেত্রে। দেশে বিস্তৃত পরিসরে মুদ্রা সরবরাহ বা ব্রড মানি বাড়লেও রিজার্ভ মানিতে দেখা গেছে সম্পূর্ণ উল্টো এবং বিপরীতমুখী প্রবণতা। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে রিজার্ভ মানি জুন মাসের ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৩৬৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৪৬১ কোটি ৪০ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে রিজার্ভ মানি কমেছে ১২ হাজার ৯০৭ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা শতকরা হিসাবে ২ দশমিক ৭১ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান থেকে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির তারল্য পরিস্থিতির একটি অত্যন্ত জটিল ও রহস্যময় চিত্র ফুটে ওঠে। একদিকে যেমন বাজারে বিস্তৃত মুদ্রা সরবরাহ বা ব্রড মানি ক্রমাগত বাড়ছে, ঠিক অন্যদিকে তেমনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রাভিত্তি বা মনিটারি বেসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এই রিজার্ভ মানি আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। এই দুই বিপরীতমুখী ধারার কারণে অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহের প্রকৃত ধরন, এর মূল উৎস এবং তারল্য ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করা নীতিনির্ধারকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং একটি বিষয় হয়ে উঠছে।
দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের চিত্রটি বিশ্লেষণ করলেও অর্থনীতির একটি মিশ্র ও চিন্তার দিক উন্মোচিত হয়। গত আগস্ট মাসে বৈদেশিক বাণিজ্যের উভয় দিকেই, অর্থাৎ আমদানি ও রপ্তানি—উভয় ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে দেশে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৪১ কোটি ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার। এই আয় আগের বছরের আগস্ট মাসের তুলনায় ৫৩ কোটি ১১ লাখ ডলার বেশি, যা শতকরা হিসাবে ১৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। রপ্তানি খাতের এই প্রবৃদ্ধি অবশ্যই দেশের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সংবাদ। কিন্তু এর অন্য পিঠে তাকালে দেখা যায়, আগস্ট মাসে দেশে মোট আমদানির পরিমাণ ছিল ৬১১ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে দেশে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৮৯ কোটি ১১ লাখ ডলার, যা শতকরা হিসাবে ১৭ দশমিক ০৬ শতাংশ। এই হিসাব থেকে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে, আগস্ট মাসে দেশে আমদানি বৃদ্ধির হার রপ্তানি বৃদ্ধির হারের চেয়ে ৩ দশমিক ৩৯ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি ছিল। শুধু এক আগস্ট মাসের হিসাবেই রপ্তানি আয় ও আমদানি ব্যয়ের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি বা ব্যবধান গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬৯ কোটি ৮৩ লাখ ডলারে। আমদানি বাড়ার পেছনে দেশের শিল্পের কাঁচামাল, ভারী মূলধনী যন্ত্রপাতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং সাধারণ ভোগ্যপণ্যের বর্ধিত চাহিদাসহ বিভিন্ন ধরনের কারণ থাকতে পারে। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ আমদানি বৃদ্ধির মূল কাঠামো বা বিন্যাস বিশ্লেষণ না করে শুধুমাত্র আমদানি বৃদ্ধি পাওয়াটা দেশের অর্থনীতির জন্য পুরোপুরি ইতিবাচক নাকি নেতিবাচক—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এখনই যাওয়া ঠিক হবে না। বরং দেশের উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী আমদানি কতটা হচ্ছে এবং শুধু ভোগনির্ভর আমদানি কতটা হচ্ছে—তা চুলচেরা বিশ্লেষণ করাটা দীর্ঘমেয়াদী অর্থনীতির স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্ষেত্রেও স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী চিত্রের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আগস্ট মাস শেষে বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাবকৃত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৪৪২৩ বিলিয়ন ডলারে। এর আগে জুন মাস শেষে এই রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক ৯০৭২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে দেশের রিজার্ভ কমেছে প্রায় ৪৬৪ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার বা ১ দশমিক ৪১ শতাংশ। এই স্বল্পমেয়াদী পতন কিছুটা উদ্বেগের হলেও, যদি আমরা এক বছরের দীর্ঘমেয়াদী চিত্র দেখি, তবে পরিস্থিতির অনেক বড় ও ইতিবাচক উন্নতি লক্ষ্য করা যায়। আগের বছরের ঠিক একই সময়ের তুলনায় আগস্ট মাস শেষে বিপিএম৬ পদ্ধতির রিজার্ভ বেড়েছে ৬ দশমিক ২৬৮৬ বিলিয়ন ডলার, যা শতকরা হিসাবে ২৩ দশমিক ৯৫ শতাংশের এক বিশাল উল্লম্ফন। একই সময়ে দেশের মোট আন্তর্জাতিক রিজার্ভ বা গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩৭ দশমিক ৩৫২৩ বিলিয়ন ডলার। অতএব, এই পরিসংখ্যান থেকে খুব সহজেই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্ষেত্রে সাময়িক বা স্বল্পমেয়াদী কিছু ওঠানামা ও চাপ থাকলেও, এক বছরের সার্বিক বিবেচনায় বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতির অবস্থানে দেশের অর্থনীতিতে একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ও শক্তিশালী উন্নতি সাধিত হয়েছে।
রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এবং বিদেশের শ্রমবাজারের তুলনামূলক চিত্রটি দেশের অর্থনীতির জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় এক বৈপরীত্য হিসেবে দেখা দিয়েছে। আগস্ট মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৯৬ কোটি ৬৬ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার। এর আগের মাস, অর্থাৎ জুলাইয়ের ২৮৫ কোটি ৮৬ লাখ ৮০ হাজার ডলারের তুলনায় আগস্ট মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১০ কোটি ৮ লাখ ১০ হাজার ডলার, যা শতকরা হিসাবে ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেশি। যদি আমরা জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাস মিলিয়ে হিসাব করি, তবে দেখা যায় যে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ বা ৯২ কোটি ৫৬ লাখ ডলার। প্রবাসী আয়ের এই শক্তিশালী প্রবাহ অবশ্যই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের জন্য একটি বড় স্বস্তির বিষয়। কিন্তু এর ঠিক পাশাপাশি দেশের শ্রমবাজারে সম্পূর্ণ নতুন ও গভীর একটি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আগস্ট মাসে ৬২ হাজার ৯২৯ জন বাংলাদেশী নাগরিক কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে গেছেন। কিন্তু জুলাই মাসের তুলনায় আগস্টে এই বিদেশে যাওয়ার সংখ্যা কমেছে ৮ হাজার ১৫৫ জন বা ১১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এর চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও শঙ্কার বিষয় হলো, ২০২৬ সালের জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসে বিদেশে কর্মসংস্থানে যাওয়া মোট মানুষের সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৬ হাজার ৯৪৬ জন বা ৩৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে গেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বর্তমান সময়ে রেমিট্যান্সের যে বিশাল বৃদ্ধি আমরা দেখতে পাচ্ছি, তার সাথে মূলত অতীতে বিদেশে যাওয়া শ্রমিকদের আয়ের একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে নতুন করে কর্মী যাওয়ার এই প্রবাহ যদি দীর্ঘমেয়াদে এভাবেই কমতে থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে দেশের রেমিট্যান্স আয়ের ওপর এর এক ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি অত্যন্ত সম্ভাব্য নীতিগত উদ্বেগের বিষয়।
দেশের আর্থিক লেনদেনের ধরন ও কাঠামোতেও এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী পরিবর্তন অব্যাহত রয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মানুষের সরাসরি উপস্থিতির চেয়ে ডিজিটাল লেনদেনের দিকে ঝোঁক বাড়ছে। জুলাই মাসে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন জুন মাসের তুলনায় ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ কমে গিয়ে ১ লাখ ৭৪ হাজার ১২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। তবে যদি এক বছরের ব্যবধানে তুলনা করা হয়, তবে দেখা যাবে যে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের এই লেনদেন বেড়েছে প্রায় ৫৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ। অন্যদিকে, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস-এর মাধ্যমে লেনদেন জুলাই মাসে ব্যাপক হারে বেড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৬ হাজার ৫১২ কোটি টাকায়। জুন মাসের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ হলেও, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় তা ৪৫ দশমিক ৭৩ শতাংশের এক বিশাল মাইলফলক স্পর্শ করেছে। এর ঠিক উল্টো চিত্র দেখা গেছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে। সেখানে লেনদেন জুলাই মাসে ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ কমে গিয়ে ৬০ হাজার ৩৩২ কোটি ৯০ লাখ টাকায় নেমে এসেছে এবং এক বছরের দীর্ঘমেয়াদী তুলনায় তা কমেছে ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। লেনদেনের এই আধুনিক রূপান্তর দেশের অর্থনীতির ডিজিটালাইজেশনের একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।
দেশের সুদবাজার বা মানি মার্কেটেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা স্বস্তির বাতাস বইতে শুরু করেছে। আগস্ট মাসে কলমানি মার্কেটের ভারিত গড় ঋণ ও ধারদানের হার জুলাই মাসের তুলনায় ৩০ বেসিস পয়েন্ট কমে গিয়ে ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশে নেমে এসেছে। আগের বছরের ঠিক একই সময়ে এই সুদের হার ছিল ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ, যার তুলনায় বর্তমান হারটি ৬৪ বেসিস পয়েন্ট কম। কলমানি মার্কেটের এই নিম্নমুখী প্রবণতা দেশের স্বল্পমেয়াদী অর্থবাজারে কিছুটা তারল্য স্বস্তির একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করতে পারে। কিন্তু এখানেও একটি মৌলিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়। কলমানি রেট কমার এই যে সুফল, তা শেষ পর্যন্ত দেশের বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে কতটা পৌঁছাচ্ছে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এর ফলে কতটা কম সুদে ঋণ পাচ্ছেন, সেটিই এখন দেখার মূল বিষয়। কারণ ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি ভালো হলেও যদি বেসরকারি উদ্যোক্তারা কাঙ্ক্ষিত সুদে ঋণ না পান, তবে এই সামষ্টিক স্থিতিশীলতা বাস্তবে কোনো কাজেই আসবে না।
সার্বিক পর্যালোচনায় এটি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায় যে, বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান চিত্রটি মোটেও একরৈখিক বা সরল নয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, রেমিট্যান্সের প্রবাহ অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, রপ্তানি বাণিজ্য ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং সাধারণ মূল্যস্ফীতিও আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে ঠিক সমান্তরালভাবে সরকারি ঋণের পাহাড় দ্রুত বড় হচ্ছে, বেসরকারি ঋণের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনক হারে কমেছে, রপ্তানির চেয়ে বেশি গতিতে আমদানি ব্যয় বাড়ছে এবং বিদেশে নতুন কর্মসংস্থানের প্রবাহে এক বিশাল পতন ঘটেছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির এই সুফল অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বা উৎপাদনশীল খাতে কতটা পৌঁছাচ্ছে? সরকারি ঋণের এই অতি দ্রুত ও আগ্রাসী সম্প্রসারণ যদি শেষ পর্যন্ত বেসরকারি বিনিয়োগের জায়গাকে সংকুচিত করে ফেলে, তাহলে বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়লেও দেশের প্রকৃত উৎপাদন, শিল্পের টেকসই সম্প্রসারণ এবং কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানে কোনোভাবেই গতি আসবে না। আবার আমদানি বৃদ্ধির বড় অংশ যদি দেশে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি বিনিয়োগে যায়, তাহলে তা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিকে শক্ত করতে পারে। কিন্তু এই বিপুল আমদানি যদি প্রধানত ভোগনির্ভর বা কনজ্যুমার গুডস-ভিত্তিক হয়, তাহলে বৈদেশিক বাণিজ্যের লেনদেনে এক নতুন ও ভয়ংকর চাপ তৈরি হতে পারে। একইভাবে রেমিট্যান্সের বর্তমান শক্তিশালী প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক হলেও বিদেশে নতুন শ্রমিক যাওয়ার হার কমে যাওয়ার বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের এখনই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নজরে রাখা প্রয়োজন। সামগ্রিকভাবে জুলাই-আগস্ট মাসের এসব তথ্য-উপাত্ত আমাদের এই বার্তাই দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি হয়তো একটি স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছে, কিন্তু বাজারে অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং সেই সাথে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির মধ্যে এখনো একটি বিশাল ও উদ্বেগজনক ব্যবধান রয়ে গেছে। আগামী মাসগুলোতে সঠিক নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে সেই ব্যবধান কমিয়ে আনাই হবে দেশের আর্থিক নীতি, ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য অন্যতম প্রধান ও সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।