শিরোনামঃ
বিশ্বজুড়ে আবারও বাড়ছে মানুষের গড় আয়ু: ডব্লিউএইচও কঠোর নিরাপত্তায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছেছে ইউরেনিয়াম চীনের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে বাংলাদেশকে থামাতে পারবে না যুক্তরাষ্ট্র ইলন মাস্কের সঙ্গে বিচ্ছেদ নিয়ে যে বার্তা দিলেন জিলিস কোনো অন্যায়কে বিএনপি সরকার ছাড় দেবে না: প্রতিমন্ত্রী টুকু আখতারুজ্জামানের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে মুক্তি দিতে হবে: গোলাম পরওয়ার মাল্টার কেজি ৫২০ টাকা, দাম নিয়ে ব্যবসায়ীদের জবাব চাইলেন বাণিজ্যমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৮ মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ১১২২ ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৬০৮ গাজীপুরে গার্মেন্টসে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ৯ ইউনিট
রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫০ পূর্বাহ্ন

অভিবাসী শ্রমিকদের পরিশ্রম আড়ালেই থেকে যায়: রূপা হক

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ বার
প্রকাশ: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬

ব্রিটিশ বাংলাদেশি সংসদ সদস্য রূপা হক বলেছেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি মাতৃভূমিতে আরও বেশি আসতে চাই। আগে আমি যখন বাংলাদেশে আসতাম, তখন রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে সবাই আমাকে ‘আপা’ বা ‘আপু’ বলে ডাকত। আর এবার আমি ‘খালামণি’ হয়ে গেছি! গতকালও একজন আমাকে ‘খালামণি, খালামণি’ বলে ডাকছিল! এটা প্রমাণ করে যে আমারও বয়স বেড়েছে। তবে এই সম্মান জানানোর সংস্কৃতিটা দেখা চমৎকার, যা যুক্তরাজ্যে আমাদের নেই। যারা আগে আমাকে দোকানে বা হোটেলে ‘বোন’ বলে ডাকত, তারা এখন আমাকে ‘আন্টি’ বলে ডাকছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, আমি বুড়িয়ে যাচ্ছি! শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীতে পঞ্চম বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে ‘বাংলাদেশ সীমানা ছাড়িয়ে প্রবাসী’ শীর্ষক এক সেশনে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

রূপা হক বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের এই ধারণা বা বিষয়টি নিয়ে আমি আপনাদের সঙ্গে আমার কিছু একান্ত ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা শেয়ার করতে চাই। আমরা আসলে কী নিয়ে কথা বলছি? পরিসংখ্যানই এর প্রমাণ দেয়।

সরকারি হিসেবে ৮৭ লাখ বাংলাদেশি দেশের বাইরে বসবাস করেন। আর বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যা ১ কোটি ৩০ লাখ পর্যন্ত হতে পারে।
এর অর্থ কী? এর অর্থ হলো, বাংলাদেশ এবং বহির্বিশ্বের মধ্যে অনবরত একটি দ্বিমুখী যাতায়াত বা আদান-প্রদান চলছে। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক প্রবাসী আছেন সৌদি আরবে, প্রায় ৩৫ লাখ। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যে এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তবে প্যারিসের গার দ্যু নর্দ এলাকাতেও বেশ বড় বাঙালি কমিউনিটি রয়েছে। সেখানে বাংলায় লেখা সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। স্পেনের মাদ্রিদ শহরের লাভাপিয়েস এলাকাতেও একই চিত্র, বাঙালি পাড়া, সারি সারি বাঙালি দোকান, যেখানে আপনি বাংলা খাবার, এমনকি ইলিশ মাছও খেতে পারবেন। হ্যাঁ, এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয় যে আমাদের সংস্কৃতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, তবে বাংলাদেশি ডায়াস্পোরা বা প্রবাসীদের এই বিষয়টি বেশ জটিল। কারণ এর মধ্যে আমার বাবা-মায়ের মতো মানুষরাও আছেন, যারা ১৯৬০-এর দশকে, অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্মেরও আগে পূর্ব পাকিস্তান আমলে দেশান্তরী হয়েছিলেন। আবার আমার মতো মানুষও আছেন, যার জন্ম লন্ডনে এবং যে ১৭ বছর বয়সের আগে কখনো বাংলাদেশে আসেনি। আবার এমন অনেক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি আছেন, যারা জীবনে কখনো বাংলাদেশে আসেননি। তাই প্রজন্ম, ভৌগোলিক অবস্থান এবং সামাজিক শ্রেণির ভিন্নতার কারণে এই বিষয়টি বেশ বৈচিত্র্যময়। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে নির্বাচিত হওয়ার আগে আমি একজন সমাজবিজ্ঞানী ছিলাম এবং সামাজিক শ্রেণি নিয়ে আমার বেশ আগ্রহ ছিল।

তাছাড়া যুক্তরাজ্যে থাকা বাংলাদেশিদের বিশাল একটি অংশ সিলেট অঞ্চলের হলেও, যুক্তরাজ্যের বাইরে অন্য এলাকার মানুষও অনেক আছেন। যেমন, আমার বাবা-মা এসেছেন পাবনা থেকে। আর আমার মনে হয়, পাবনা বলতেই মানুষের পাবনা মানসিক হাসপাতালের কথা মনে পড়ে যায়। আমার নানা সেই হাসপাতালটি তৈরি করেছিলেন।

তো দেখুন, যেমনটা আমি বলছিলাম, এই প্রবাসী সমাজকে ঢালাওভাবে বিচার করা খুব সহজ, কিন্তু এটা আসলে অনেক বিশাল এবং বৈচিত্র্যময়।

এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমজীবী মানুষের বিষয়টিও জড়িত। সেখানে লাখ লাখ বাংলাদেশি কাজ করেন, যাদের জীবনযাত্রা অনেক ক্ষেত্রেই অনেকটা দাসত্বের মতো। কাতারে বিশ্বকাপের সময় আমরা দেখেছি, স্টেডিয়ামগুলোর নির্মাণকাজে অনেক বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক যুক্ত ছিলেন। প্রচণ্ড গরমে, কঠিন পরিস্থিতিতে তারা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন। তারা আড়ালেই থেকে যান, ওই দেশগুলোর মূল জনসংখ্যার কাছে তারা অদৃশ্যই থাকেন। কিন্তু তারাই দেশে রেমিট্যান্স পাঠান।

এই রেমিট্যান্স অর্থনীতির কথা এই কনফারেন্সে এখন পর্যন্ত সেভাবে বলা হয়নি। প্রতি বছর এর পরিমাণ আনুমানিক ৩০.০৪ বিলিয়ন পাউন্ড। প্রতি বছর বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠান। এই অর্থ দেশের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখছে। আপনি যদি সিলেটে যান, দেখতে পাবেন বিশাল সব অট্টালিকা। এগুলো পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের মতো ঐতিহ্যগতভাবে দরিদ্র এলাকার প্রবাসীদের টাকায় তৈরি। বাংলাদেশে যে ছয় মাস তারা থাকেন, একেবারে রাজপুত্রের মতো জীবনযাপন করেন, কিন্তু যুক্তরাজ্যে তাদের জীবনযাত্রার মান হয়তো ততটা ভালো নয়। তবে এসব প্রতিনিয়তই বদলাচ্ছে।

আমি পেশায় একজন সমাজবিজ্ঞানী ছিলাম। ১৯৯০-এর দশকে আমি যখন পিএইচডি করছিলাম, তখনকার সাহিত্য ও গবেষণায় আমার মতো দ্বিতীয় প্রজন্মের মানুষদের কথা বলা হতো, যারা দুটি সংস্কৃতির মাঝে আটকে আছে, বিভ্রান্ত এবং যাদের আত্মপরিচয়ের সংকট রয়েছে। আমার মনে হয়, এসব এখন পুরোনো চিন্তাভাবনা। এখন আপনি চাইলেই একজন গর্বিত ব্রিটিশ-বাংলাদেশি হয়েও যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট সদস্য হতে পারেন। আমি নিজে এমন একটি এলাকা থেকে চারবার নির্বাচিত হয়েছি, যেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাংলাদেশি নন।

তাই যে গৎবাঁধা ধারণা আছে যে, বাঙালিরা কেবল ইংল্যান্ডে গিয়ে রেস্তোরাঁয় হাড়ভাঙা খাটুনি খাটে, ঘাম ঝরায় আর টেবিল মোছে, তা পুরোপুরি ঠিক নয়। সবাই সেখানে ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁয় কাজ করেন না। আমাদের মধ্যে ডাক্তার আছেন, আইনজীবী আছেন। দ্বিতীয়, তৃতীয় প্রজন্মের পাশাপাশি এখন চতুর্থ প্রজন্মও এগিয়ে আসছে, যেমন আমার সন্তান তৃতীয় প্রজন্মের।

‘নতুন করে গড়ে ওঠা এক বিশ্বে ক্ষমতা, প্রযুক্তি ও আস্থার পথচলা’ স্লোগানে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এই সম্মেলনের আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)। এই অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে শতাধিক দেশের প্রায় ২শ জন বক্তা, ৩শ জন প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দিয়েছেন। এতে সাবেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, কূটনীতিক, গবেষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, উদ্ভাবক ও তরুণ নেতৃত্ব অংশ নিয়েছেন। তিন দিনব্যাপী এ আন্তর্জাতিক সম্মেলন আগামী ৫ অক্টোবর শেষ হবে।


এ জাতীয় আরো খবর...