শিরোনামঃ
স্টার্টআপে অর্থায়ন খরা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা আকাশে আয়ের নতুন দিগন্ত, কতটা প্রস্তুত বিমান? কাগজে ৪৮ হাজার কমিটি, বাস্তবে নেই মশা মারার উদ্যোগ আমদানি করা জ্বালানির চেয়ে সাশ্রয়ী: সৌরবিদ্যুতে জোর দিচ্ছে সরকার বিশ্বের ৫০০ ভালো শহরের তালিকায় নেই বাংলাদেশের কোনো শহর কোমর ব্যথায় করণীয় জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সচল: কঠিন শর্তের ৩৩০ কোটি ডলার ঋণ নিচ্ছে সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দক্ষ মানবসম্পদ গড়তে হবে : ববি হাজ্জাজ ঢাকার সব ফুটপাত দখলমুক্ত করা হবে: ডিএনসিসি প্রশাসক ধারাবাহিক চীন সফর দুদেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেবে: জনপ্রশাসন উপদেষ্টা
শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৬ অপরাহ্ন

জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সচল: কঠিন শর্তের ৩৩০ কোটি ডলার ঋণ নিচ্ছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬

দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি নিরবচ্ছিন্ন রাখার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে মোট ৩৩০ কোটি মার্কিন ডলারের কঠিন শর্তের বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘অনমনীয় ঋণ সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি’র (এসসিএনসিএল) এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় এই বিপুল পরিমাণ ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন লাভ করে। অনুমোদিত এই ঋণের অর্থের মধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগের অধীনে সম্পূর্ণ নতুন একটি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ২০ কোটি ডলার এবং দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে জরুরি আমদানির জন্য ভূতাপেক্ষ অনুমোদনে ৩১০ কোটি ডলার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মূলত দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং দ্রুত শিল্পায়ন ও নাগরিক জীবনের বিদ্যুৎ প্রবাহকে স্থিতিশীল রাখার স্বার্থেই এই বড় অঙ্কের বাণিজ্যিক ধাঁচের ঋণ নেওয়া হচ্ছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বা ইআরডি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, অনুমোদিত ঋণের প্রথম অংশটি খরচ হবে বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে। বিদ্যুৎ বিভাগের অধীনস্থ বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড বা বিআরইবি কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট’-এর অনুকূলে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবি থেকে ২০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ গ্রহণের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে স্থায়ী কমিটি। ইআরডির কার্যপত্রে এডিবির এই ঋণের সুদের হার এবং অন্যান্য কঠিন শর্তাবলির বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। শর্ত অনুযায়ী, এডিবির ঋণের সুদের হার নির্ধারিত হয়েছে সিকিউর্ড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেটের (এসওএফআর) সঙ্গে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ স্প্রেড যুক্ত করে। ঋণটির মোট মেয়াদ ২৫ বছর নির্ধারণ করা হলেও এতে গ্রেস পিরিয়ড বা রেয়াতকাল রাখা হয়েছে মাত্র ৫ বছর। এর পাশাপাশি ঋণগ্রহীতাকে অতিরিক্ত শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ ম্যাচিউরিটি প্রিমিয়াম এবং প্রতি বছর শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ হারে কমিটমেন্ট চার্জ বহন করতে হবে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী কোনো ঋণের রেয়াতী উপাদান বা গ্র্যান্ট এলিমেন্ট ২৫ শতাংশের বেশি হলে তাকে সহজ বা নমনীয় ঋণ বলা হয়, কিন্তু এডিবির এই বিশেষ ঋণে গ্র্যান্ট এলিমেন্ট রয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। ফলে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় উভয় আর্থিক সংজ্ঞার্থেই এটি অনমনীয় বা অত্যন্ত কঠিন শর্তের ঋণ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এডিবির এই ২০ কোটি ডলারের ঋণের মূল লক্ষ্য হলো ঢাকা শহরের সংলগ্ন ও পার্শ্ববর্তী ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পিবিএস) এলাকার বিতরণ ব্যবস্থার সার্বিক সক্ষমতা এবং পরিবেশবান্ধব রূপান্তর নিশ্চিত করা। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে ২০৩১ সালের জুলাই মেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য এই মেগা প্রকল্পের আওতায় ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি করা হবে। প্রকল্পের মূল কাজের মধ্যে রয়েছে নতুন বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র বা সাবস্টেশন নির্মাণ, বিদ্যমান সাবস্টেশনগুলোর সক্ষমতা সম্প্রসারণ, মাটির নিচ দিয়ে ভূগর্ভস্থ আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন স্থাপন, মানসম্মত ওভারহেড লাইন নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ অপচয় রোধে ইনসুলেটেড কন্ডাক্টর স্থাপন। বিদ্যুৎ লাইনে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে তা দ্রুত শনাক্ত ও মেরামতের জন্য আধুনিক ডিজিটাল মনিটরিং এবং ফল্ট লোকেটর প্রযুক্তিও এই প্রকল্পে যুক্ত করা হবে। বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের মতে, এই প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে বিতরণ ব্যবস্থার কারিগরি লোকসান বা সিস্টেম লস উল্লেখযোগ্য হারে কমবে এবং রাজধানীর পার্শ্ববর্তী শিল্প ও আবাসিক গ্রাহকদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত ভোল্টেজের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

অনুমোদিত ঋণের দ্বিতীয় এবং বৃহত্তম অংশটি ব্যয় হবে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা অটুট রাখার অপরিহার্য প্রয়োজনে। সৌদি আরবের জেদ্দাভিত্তিক আন্তর্জাতিক ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন বা আইটিএফসি থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩১০ কোটি ডলারের স্বল্পমেয়াদি অনমনীয় ঋণের ভূতাপেক্ষ অনুমোদন দিয়েছে এসসিএনসিএল কমিটি। এর মধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ব্যয় করা হবে ২৫০ কোটি ডলার। অবশিষ্ট ৬০ কোটি ডলার খরচ করা হবে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্পট ও দীর্ঘমেয়াদি বাজার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির কাজে। ইআরডির তথ্য মতে, আইটিএফসির এই স্বল্পমেয়াদি ঋণের মেয়াদ হবে মাত্র ছয় মাস এবং এর সুদের হার নির্ধারিত হয়েছে ছয় মাসের টার্ম এসওএফআরের সঙ্গে ১ দশমিক ৭০ শতাংশ মার্জিন বা স্প্রেড যোগ করে। এই সুদের হার বিগত বছরের অনুরূপ জ্বালানি ঋণের বার্ষিক হারের তুলনায় সামান্য কম হলেও সামগ্রিক বৈশ্বিক আর্থিক প্রেক্ষাপটে তা যথেষ্ট ব্যয়বহুল। ৩১০ কোটি ডলারের এই বিশাল অর্থায়নের মধ্যে আইটিএফসি নিজস্ব তহবিল থেকে সংস্থান করবে ৬০ কোটি ডলার, আর বাকি ২৫০ কোটি ডলারের সংস্থান করা হবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্যাংকের সিন্ডিকেশন ও কো-ফাইন্যান্সিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজার ও আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, কঠিন শর্তের বা অনমনীয় এই ধরনের বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের পেছনে একাধিক অর্থনৈতিক চাপ ও কৌশলগত বাস্তবতা কাজ করে থাকে। সাধারণত আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো থেকে সহজ শর্তের রেয়াতি ঋণ পাওয়া সময়সাপেক্ষ এবং সেগুলোতে থাকে নানা সংস্কারের কঠোর রাজনৈতিক ও আইনি পূর্বশর্ত। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখা এবং কলকারখানা ও পরিবহনের চাকা চালু রাখতে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য ওঠানামা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে এ ধরনের বহুজাতিক ট্রেড ফাইন্যান্স সুবিধার আশ্রয় নিতে হয়। তবে এই ঋণের কঠিন শর্ত এবং উচ্চ সুদের হার দেশের সামগ্রিক ঋণ ব্যবস্থাপনা ও ভবিষ্যতের দায় পরিশোধের সক্ষমতার ওপর নিশ্চিতভাবেই বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন যে, সহজ শর্তের ঋণের বদলে যখন অনমনীয় বাণিজ্যিক ঋণ বৃদ্ধি পায়, তখন সরকারি কোষাগার থেকে অতিরিক্ত সুদ পরিশোধের ব্যয়ভার বেড়ে যায়, যা পরোক্ষভাবে দেশের করদাতা ও ভোক্তাদের ওপর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির আকারে নেমে আসার আশঙ্কা থাকে।

তবে অনমনীয় এসব ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকার আর্থিক শৃঙ্খলার নির্ধারিত দিকনির্দেশনা ও বিধিনিষেধ মেনেই অগ্রসর হচ্ছে বলে ইআরডির প্রতিবেদনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি আর্থিক বিধিমালা এবং আন্তর্জাতিক ঋণ নির্দেশিকা অনুযায়ী, বিদেশি কোনো অনমনীয় বা বাণিজ্যিক ঋণের দায় পরিশোধের মোট বার্ষিক ব্যয় কোনো অবস্থাতেই সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের মোট রপ্তানি আয়ের ১০ শতাংশ কিংবা মোট রাজস্ব আয়ের ১৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। এই কড়া অর্থনৈতিক সীমা ও নীতিমালার আলোকেই প্রস্তাবিত ঋণগুলোর সার্বিক উপযোগিতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হয়েছে। সভায় দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা, নিজস্ব রাজস্ব ও পরিচালন আয় থেকে যথাসময়ে ঋণ পরিশোধের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং জাতীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তার অপরিহার্য অগ্রাধিকার বিবেচনা করেই এই বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করা হয়। সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশা, যথাযথ তদারকি ও দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই ঋণের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বিদ্যুৎ বিতরণের অপচয় রোধ হবে এবং বিশ্ববাজার থেকে জ্বালানির নিয়মিত সরবরাহ অব্যাহত রেখে অর্থনীতিকে গতিশীল রাখা সম্ভব হবে।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


এ জাতীয় আরো খবর...