‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার। নতুন এই অধ্যাদেশে সৌরবিদ্যুৎ চুরি ও যন্ত্রাংশের ক্ষতিসাধনের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ খাতে সরকার যখন বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে এর বিস্তার বাড়াতে চাইছে এবং এখাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নিয়েছে, তখনই জারি করা হলো এই অধ্যাদেশ।
অধ্যাদেশের বিধান অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুৎ কিংবা এর যন্ত্রাংশ চুরির অপরাধে সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
অন্যদিকে, সৌরবিদ্যুতের কোনো যন্ত্রাংশ বা অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা বিনষ্ট করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
এর আগে গত রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে অধ্যাদেশটির খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিসভা সচিব নাসিমুল গনি জানান, বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে এটি আরও বেশি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, “চলমান বৈশ্বিক সংঘাত ও যুদ্ধের প্রভাব দেখিয়ে দিয়েছে যে, যুদ্ধ বা সংঘাতময় পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতে বাংলাদেশ কতটা নাজুক অবস্থায় পড়তে পারে। এ কারণেই সরকার সৌরবিদ্যুতের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে।”
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সরকারি ভবন, আবাসিক ভবনের ছাদ, প্রাঙ্গণ, ভবনের সংলগ্ন অনাবাদী জমি এবং জলাশয়ে সর্বোচ্চ ৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা যাবে।
এই নীতিমালার আওতায় সৌরচালিত সেচ পাম্প, কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার, বৈদ্যুতিক যান (ইভি) চার্জিং স্টেশন, চা বাগান, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং কৃষিভিত্তিক সৌরপ্রযুক্তি বা ‘এগ্রিভোল্টাইক’ ব্যবস্থা (যেখানে কৃষিকাজের সাথে সাথে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়) অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে বিশাল পরিসরের ভূমিভিত্তিক (গ্রাউন্ড-মাউন্টেড) বড় মেগা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো এই অধ্যাদেশের আওতার বাইরে থাকছে।
সরকার এখাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মূলত দুটি মডেল চালু করেছে—একটি হলো ‘অপারেটিং এক্সপেনডিচার’ (বা ওপেক্স) এবং অন্যটি ‘ক্যাপিটাল এক্সপেনডিচার’ (বা ক্যাপেক্স)। ওপেক্স মডেলের অধীনে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান নিজ খরচে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল ও সরঞ্জাম স্থাপন করবে; আর ক্যাপেক্স মডেলের আওতায় গ্রাহক প্রতিষ্ঠান নিজ অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে এবং প্যানেলের পূর্ণ মালিকানা তাদের হাতেই থাকবে।
অধ্যাদেশে গ্রাহক, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে এক ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই চুক্তিতে সরঞ্জামের মান, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ বণ্টন, বিল পরিশোধ, মালিকানা এবং যৌথ বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকবে।
একই সাথে, নেট-মিটারিং ব্যবস্থার অধীনে থাকা গ্রাহকরা নিজেদের চাহিদা মেটানোর পর উৎপাদিত অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবেন। গ্রিডে সরবরাহকৃত বিদ্যুতের দাম তাঁদের মাসিক বিলের সাথে সমন্বয় করা হবে, এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সরকার-নির্ধারিত ট্যারিফ বা মূল্যে গ্রাহকরা নগদ অর্থও পেতে পারেন।
ক্যাপেক্স মডেলের অধীনে, প্রয়োজনীয় মালামাল ও সংশ্লিষ্ট সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ই-জিপি ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক না করে সীমিত দরপত্র পদ্ধতির (লিমিটেড টেন্ডারিং) মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকার আর্থিক সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
নীতিমালা প্রণয়ন এবং সৌরবিদ্যুতের প্রসার সহজতর করতে একটি ‘জাতীয় নীতি পরিষদ’-এর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষ কারিগরি ও সমন্বয় কমিটি গঠনের বিধানও রাখা হয়েছে এই অধ্যাদেশে।
অধ্যাদেশের ১২ থেকে ১৬ ধারায় চুরি, যন্ত্রাংশ ধ্বংস, অবৈধ সংযোগ প্রদান, কাজে বাধা সৃষ্টি এবং অপরাধে সহায়তার সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিবরণ দেওয়া হয়েছে। চুরি করা সৌর সরঞ্জাম ক্রয়, বিক্রয় বা নিজের হেফাজতে রাখলেও চুরির সমপরিমাণ শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
অনুমোদন ছাড়া সৌরবিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ দেওয়া, কিংবা এমন প্রকল্প স্থাপন, পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে বাধা প্রদানের জন্য ৩ বছরের কারাদণ্ড, ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
অধ্যাদেশের অধীনে সংগঠিত অপরাধগুলোর বিচার প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সম্পন্ন হবে।
পাশাপাশি মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিলভুক্ত অপরাধের ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালত-ও এসব অপরাধের বিচার ও তাৎক্ষণিক শাস্তি প্রদান করতে পারবে।