শিরোনামঃ
উন্নয়নের মরীচিকা ও মেগা প্রকল্পের ফাঁদ: প্রতিশ্রুতির আড়ালে একই খাদের কিনারে অর্থনীতি মোংলা বন্দর ঘুরে দেখলেন প্রধানমন্ত্রী আমি শোকর করি, কারণ… রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আগুন, ৪০ রোগী আহত পিএইচপির ত্রুটি: ঝুঁকিতে লাখো ওয়েবসাইট, বিশ্বজুড়ে সাইবার সতর্কতা ধেয়ে আসছে সুপার টাইফুন, ঘণ্টায় গতিবেগ ২২৭ কিলোমিটার ৫৯২ কোটি টাকায় দুই কূপ খনন, জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ‘বিপুল গ্যাস’ প্রধানমন্ত্রীর সফরে টোকিওতে থাকবেন না রাষ্ট্রদূত, সমন্বয়ে পররাষ্ট্রসচিব রূপগঞ্জে ট্রাকের ধাক্কায় অটোরিকশার দুই যাত্রী নিহত, আহত ৩ ৭ দল নিয়ে ‘সমমনা ইসলামী দল’ ঘোষণা, একসঙ্গে চলার অঙ্গীকার
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৮ অপরাহ্ন

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির সময়সীমা অনিশ্চিত

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৯ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬

জাতীয় বেতন স্কেলের নতুন সুযোগ-সুবিধা সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ধাপে ধাপে কার্যকর হতে শুরু করলেও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান্থলি পে-অর্ডার বা এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এটি ঠিক কবে নাগাদ বাস্তব রূপ পাবে, তা নিয়ে এখনো কোনো সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত দিনক্ষণ নির্ধারণ করতে পারেনি সরকার। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য গত জুলাই মাস থেকে কার্যকর হওয়া সংশোধিত আর্থিক সুবিধার অংশ হিসেবে চলতি মাসেই বকেয়াসহ বর্ধিত অর্থ তাঁদের হাতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। কিন্তু দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সিংহভাগ দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে চলা ছয় লাখেরও বেশি নন-গভর্নমেন্ট শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন স্কেলের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি এখনো প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রক্রিয়ার জটিল মারপ্যাঁচে আটকে রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি স্তরের এই বিশাল শিক্ষক সমাজের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করা হয়নি। তবে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি বছরের শেষ মাস অর্থাৎ ডিসেম্বর নাগাদ তাঁরা সংশোধিত এই স্কেলের সুফল পেতে পারেন বলে একটি ইতিবাচক সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে।

হিসাব-নিকাশ করে দেখা গেছে, বিশাল এই কর্মীবাহিনীকে নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধার আওতায় নিয়ে আসতে রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে অতিরিক্ত এক বিশাল অঙ্কের অর্থ সংস্থানের প্রয়োজন হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, দেশের ৩০ হাজার ৯৩২টি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত মোট ৬ লাখ ২ হাজার ৩৫৯ জন শিক্ষক ও কর্মচারীর পেছনে নতুন কাঠামো কার্যকর করতে সরকারের অতিরিক্ত ১৩ হাজার ৩৯২ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। এই বিপুল আর্থিক চাহিদার সিংহভাগই ব্যয় হবে মূল বেতন ও নিয়মিত ভাতা পরিশোধের পেছনে, যার আর্থিক পরিমাণ দাঁড়াবে ১২ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা। আর অবশিষ্ট অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে এই খাতের অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের মতো দীর্ঘমেয়াদি পেনশন সহায়তার পেছনে। শিক্ষা প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই অতিরিক্ত অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাথে অত্যন্ত নিবিড় সমন্বয় রেখে জোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে, যাতে করে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই নতুন স্কেলের অর্থ শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।

অতীতের অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০১৫ সালে যখন অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল প্রবর্তন করা হয়েছিল, তখনও সরকারি চাকরিজীবীদের গেজেট প্রকাশের পর এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সেই সুবিধার আওতায় আনতে প্রায় ছয় মাস সময় লেগে গিয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, বেসরকারি খাতের এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় প্রচুর প্রশাসনিক পর্যালোচনা, বাজেটীয় সমন্বয় এবং কারিগরি প্রস্তুতির প্রয়োজন পড়ে। ফলে রাতারাতি কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর করা সম্ভব হয় না। সরকারের পক্ষ থেকে ঠিক কোন তারিখে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন বা পরিপত্র জারি করা হবে, সে বিষয়ে এখনই কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। তবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খান মঈনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীরা যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন স্কেলের আওতায় তাঁদের বেতন ও আনুষঙ্গিক ভাতা পেতে পারেন, সে লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত এবং ফলপ্রসূ আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

নতুন জাতীয় পে স্কেল ঘোষিত হওয়ার পরপরই অবশ্য শিক্ষা উপদেষ্টা বা সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের এই সুবিধার বাইরে রাখা হবে না। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে অতীতের মতো এবারও একটি স্বতন্ত্র পরিপত্র বা সার্কুলার জারির মাধ্যমে তাঁদের বেতন সমন্বয় করা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য কোনো পৃথক পে স্কেল থাকবে না, বরং তাঁরা তাঁদের বিদ্যমান গ্রেড অনুযায়ী জাতীয় পে স্কেলের সংশোধিত মূল বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্ত হবেন। ২০১৫ সালে অষ্টম বেতন স্কেলের সময়ও ঠিক এই আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো অনুসরণ করেই শিক্ষক সমাজকে সুবিধা দেওয়া হয়েছিল।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া প্রস্তাবিত গ্রেডভিত্তিক হিসেব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নতুন স্কেলে প্রতিটি ধাপে প্রায় শতভাগ বা তারও বেশি বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। নতুন জাতীয় বেতন স্কেলের কাঠামো অনুযায়ী, সর্বনিম্ন অর্থাৎ ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে এক লাফে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াচ্ছে ২০ হাজার টাকায়। অন্যদিকে কাঠামোর সর্বোচ্চ বা প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে উন্নীত হয়ে দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকায়। এই কাঠামোর সাথে মিল রেখে চতুর্থ গ্রেডে থাকা একটি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষের বর্তমান মূল বেতন ৫০ হাজার টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ টাকায় উন্নীত হবে। ষষ্ঠ গ্রেডে কর্মরত একজন সহকারী অধ্যাপকের মূল বেতন ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৭১ হাজার টাকায়। কলেজ পর্যায়ে নবম গ্রেডে প্রবেশ করা একজন প্রভাষকের মূল বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে উন্নীত হয়ে হবে ৪৪ হাজার টাকা।

মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্তরেও এই বেতন বৃদ্ধির প্রভাব হবে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। সেখানে দশম গ্রেডে থাকা সহকারী শিক্ষক এবং বিএড ডিগ্রিধারী সহকারী শিক্ষকেরা বর্তমানে যে ১৬ হাজার টাকা মূল বেতন পান, নতুন স্কেলে তা একলাফে দ্বিগুণ হয়ে ৩২ হাজার টাকায় পৌঁছাবে। আর যেসব সহকারী শিক্ষক এখনও বিএড সম্পন্ন করতে পারেননি, তাঁরা বর্তমানে একাদশ গ্রেডে ১২ হাজার ৫০০ টাকা স্কেলে বেতন পান, যা নতুন কাঠামোতে বৃদ্ধি পেয়ে হবে ২৫ হাজার টাকা। একই সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ২০তম গ্রেডে কর্মরত অফিস সহকারী ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০ হাজার টাকায় উন্নীত হবে। এই বিশাল অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস সাধারণ শিক্ষক ও কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে পরিচালিত এমপিওভুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা মূলত দেশের তৃণমূল পর্যায়ের সিংহভাগ শিক্ষার্থীকে শিক্ষার আলো দিয়ে থাকে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে তালিকাভুক্ত এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩০ হাজার ৯৩২টি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৬২৮ জন শিক্ষক এবং ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩১ জন কর্মচারী তাঁদের শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বর্তমানে এই বিশাল জনবলের পেছনে প্রতি বছর নিয়মিতভাবে ১৯ হাজার ২২৭ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। এর মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সাধারণ কলেজগুলোর পেছনে ব্যয় হয় ১২ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা, মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার পেছনে যায় ৫ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা এবং কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পেছনে সরকারি কোষাগার থেকে বরাদ্দ দিতে হয় ৭৬৭ কোটি টাকা।

এমপিও পদ্ধতির মৌলিক নিয়ম অনুসারে, সরকার যোগ্য ও অনুমোদিত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক ও কর্মচারীদের মূল বেতনের শতভাগ অর্থ অনুদান হিসেবে সরাসরি পরিশোধ করে থাকে। এর পাশাপাশি তাঁদের জন্য নির্ধারিত চিকিৎসা ভাতা এবং অন্যান্য সরকারি ভাতার সংস্থানও রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকেই নিশ্চিত করা হয়। পে কমিশনের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, যেহেতু বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীরা সরাসরি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নন, তাই তাঁরা সরাসরি পে কমিশনের আওতাভুক্তির বাইরে রয়েছেন। তবে কমিশন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করেছে যে দেশের বিশাল বেসরকারি শিক্ষা খাতের অবদান এবং এর আকার বিবেচনায় তাঁদের জন্য একটি সম্মানজনক বেতন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কমিশন সুপারিশ করেছে যে যেহেতু বাজেটে প্রতি বছরই তাঁদের জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়, তাই আন্তঃমন্ত্রণালয় আলোচনার মাধ্যমে তাঁদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থান নিশ্চিত করা উচিত।

এর আগে গত ৩১ আগস্ট উপদেষ্টা পরিষদ বা মন্ত্রিসভার বৈঠকে ২০২৬ সালের নবম জাতীয় বেতন স্কেলের নীতিগত ও আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়, যা ভূতাপেক্ষভাবে গত ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। সরকারি পরিকল্পনা অনুসারে, এই নতুন বেতন কাঠামো তাদের নিজস্ব কর্মচারীদের জন্য ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। যার আওতায় ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে তিনটি ধাপে সংশোধিত মূল বেতন চালু করা হবে। আর নতুন কাঠামোর বিভিন্ন বর্ধিত ভাতার অংশটি ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপের কারণে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক সমাজ নিজেদের নতুন স্কেলের সুফল পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা বা দীর্ঘসূত্রতা চান না। তাঁদের দাবি, সরকারি কর্মচারীদের মতোই দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরিপত্র জারি করে এই আর্থিক সুবিধা তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হোক, যাতে বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে তাঁরা কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেন।

তথ্যসূত্র: নিউ এজ


এ জাতীয় আরো খবর...