বাংলাদেশের প্রধানতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাক খাতের সামনে আবারও ঘনীভূত হচ্ছে এক গভীর ও জটিল অর্থনৈতিক দুর্যোগের কালো মেঘ। একদিকে ইউরোপের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেশে সাধারণ মানুষের লাগাতার রাজপথের আন্দোলন ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে সুতা সংগ্রহের ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধ এবং এর সাথে আসন্ন ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ—এই সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব ত্রিমুখী চাপের মুখে পড়েছেন দেশের পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকেরা। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কোনো সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও স্থানীয়ভাবে উৎপাদন খরচ ক্রমাগত বাড়তে থাকায় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক এই দেশটির সক্ষমতা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে ইউরোপীয় ক্রেতারা নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়ার গতি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দিয়েছেন এবং পূর্বে নিশ্চিত হওয়া অনেক কেনাকাটার চুক্তিও স্থগিত রাখার অনুরোধ জানাচ্ছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল, বেলজিয়াম ও স্পেনের মতো বড় বড় দেশগুলোতে জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয়, মাত্রাতিরিক্ত জ্বালানি খরচ, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়া আবাসন সংকট এবং সামাজিক সেবা খাতের নানা সীমাবদ্ধতা নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সাধারণ জনগণ প্রতিনিয়ত রাজপথে নেমে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ সমাবেশ করছেন। দীর্ঘস্থায়ী এই সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সরাসরি আঘাত লেগেছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে চলতি ২০২৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশে, যা আগের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালেও ছিল ১ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে ইউরোপের সাধারণ ভোক্তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের বাইরে পোশাক বা ফ্যাশন পণ্যের পেছনে অর্থ খরচ একরকম কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন, যার মারাত্মক ধাক্কা এসে পড়ছে বাংলাদেশের উৎপাদনকারী কারখানাগুলোতে।
বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় অর্ধেক বা পঞ্চাশ শতাংশ এককভাবে যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে, ফলে ওই অঞ্চলের যেকোনো ছোটখাটো অর্থনৈতিক দোলাচলও এ দেশের কারখানাগুলোর টিকে থাকার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক এই অস্থিতিশীলতার প্রথম শিকার হতে শুরু করেছে দেশের মাঝারি ও বড় নিট পোশাক প্রস্তুতকারক কারখানাগুলো। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ফ্যাশনসের শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সের বড় একজন ক্রেতা প্রাথমিকভাবে আলোচনা চূড়ান্ত হওয়ার পরও শেষ মুহূর্তে এসে বড় একটি রপ্তানি চালান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন। ফরাসি ক্রেতাদের আশঙ্কা, দীর্ঘমেয়াদি এই গণআন্দোলনের কারণে তাঁদের স্থানীয় বাজার আরও মন্দাক্রান্ত হয়ে পড়বে এবং দোকানে থাকা পোশাকগুলো বিক্রি না হয়ে পড়ে থাকার ঝুঁকি তৈরি হবে। এর ফলে নতুন করে পোশাকের মজুত বাড়ানোর সাহস পাচ্ছেন না আমদানিকারকেরা।
ডিবিএল গ্রুপ ও উর্মি গ্রুপের মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্ণধাররাও ইউরোপের চলমান অস্থিরতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ আগে থেকেই তীব্র ও বৈরী আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মোকাবিলা করে টিকে রয়েছে। এমন একটি সংবেদনশীল মুহূর্তে সেখানে যদি নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয় এবং তা কয়েক মাস ধরে স্থায়ী রূপ নেয়, তবে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে দীর্ঘমেয়াদি ধস নামার সমূহ আশঙ্কা তৈরি হবে। যদিও স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম মনে করেন যে কেবল সাময়িক বিক্ষোভই নয়, বরং ইউরোপের সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিই মূলত মানুষের পোশাক কেনার চাহিদা কমিয়ে দেওয়ার প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। শুধু ইউরোপ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও কেনাকাটার প্রবণতায় এক ধরনের নেতিবাচক ধারা লক্ষ করা যাচ্ছে, তবে ইউরোপের সার্বিক সংকট আরও বেশি জটিল ও আশঙ্কাজনক।
ইউরোপের সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসের সংকলিত উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে ইউরোপীয় বাজারে পোশাক আমদানির সার্বিক সংকটের বাস্তব প্রমাণ মেলে। পরিসংখ্যান বলছে, আলোচ্য এই আট মাসে বিশ্ববাজার থেকে ইউরোপের দেশগুলোর সামগ্রিক পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ২৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ঠিক একই সময়ে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের চেয়ে বিস্ময়করভাবে ১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। যদিও সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের দিকে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে তার হারিয়ে যাওয়া বাজার হিস্যা কিছুটা পুনরুদ্ধার করার ইঙ্গিত দিয়েছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিক্ষোভ ও ধর্মঘটের নতুন তরঙ্গ সেই ইতিবাচক ধারাকে আবারও উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার বড় শঙ্কা তৈরি করেছে।
ইউরোপীয় বাজারের এই বাহ্যিক সংকটের সমান্তরালেই দেশের ভেতরে সরকারের একটি সাম্প্রতিক নীতিগত সিদ্ধান্ত পোশাক খাতের সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশীয় বস্ত্রকল বা টেক্সটাইল মিলগুলোকে অতিরিক্ত সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলে নিট পোশাকের জন্য অপরিহার্য ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বন্ডেড ওয়্যারহাউস বা শুল্কমুক্ত আমদানির বিশেষ সুবিধা সম্প্রতি প্রত্যাহার করে নিয়েছে সরকার। সংশোধিত নতুন নীতিমালার আওতায় এখন কোনো উদ্যোক্তা বিদেশ থেকে এই মানের সুতা আমদানি করতে চাইলে তাঁকে চালান মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক গ্যারান্টি হিসেবে জমা রাখতে হচ্ছে। পরবর্তীতে সেই সুতা দিয়ে তৈরি পোশাক বিদেশে রপ্তানি করে যাবতীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাগজপত্র ব্যাংকে দাখিল করার পর তবেই সেই গ্যারান্টির অর্থ অবমুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই জটিল শর্তটি রপ্তানিকারকদের কাছে একটি বিশাল অশুল্ক বাধা বা নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার কারণে ব্যাংকগুলোতে ব্যবসায়ীদের নগদ তারল্য মারাত্মকভাবে আটকে যাচ্ছে।
আমদানির ওপর এই অযাচিত নিয়ন্ত্রণ আরোপের ফলে পোশাক কারখানাগুলো আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সস্তায় সুতা সংগ্রহের সুযোগ হারিয়ে বাধ্য হয়ে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো থেকে বেশি দামে সুতা কিনতে বাধ্য হচ্ছে। ফকির ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফকির কামরুজ্জামান নাহিদ এই পার্থক্যের এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে জানান, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করলে প্রতি কেজি ৩০ কাউন্টের উন্নত কম্বড সুতার দাম পড়ে ৩ দশমিক ১৫ মার্কিন ডলার। অথচ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সেই একই মানের সুতা কিনতে কারখানা মালিকদের গুনতে হচ্ছে ৩ দশমিক ৭৫ মার্কিন ডলার। প্রতি কেজিতে শূন্য দশমিক ৬০ ডলারের এই বিশাল ফারাকের কারণে প্রতিটি নিট পোশাকের গড় উৎপাদন ব্যয় অনায়াসেই শূন্য দশমিক ১৫ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। অথচ ইউরোপের চরম মন্দাক্রান্ত বাজারে ক্রেতারা আগের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে এক সেন্টও বাড়তি অর্থ দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। উল্টো মন্দার অজুহাতে তারা প্রতিটি পণ্যের দাম আরও কমিয়ে দেওয়ার জন্য কারখানা মালিকদের ওপর অব্যাহত চাপ সৃষ্টি করছেন।
দেশের ভেতরে উৎপাদন খরচের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার সঙ্গে আরও যুক্ত হচ্ছে পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন মজুরি কাঠামো। জীবনযাত্রার উচ্চমূল্য ও অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির চাপে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। রপ্তানিকারক ও উদ্যোক্তারা নীতিগতভাবে শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম না বাড়লে এবং অভ্যন্তরীণ কাঁচামালের খরচ না কমলে অতিরিক্ত মজুরির ভার কারখানাগুলো কীভাবে বহন করবে। বিদ্যমান গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের চরম সংকট এবং কারখানায় বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের বাড়তি খরচের সাথে যদি বাড়তি মজুরি যোগ হয়, তবে বহু সাধারণ ও মাঝারি মানের কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে।
এর পাশাপাশি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে বেশ পিছিয়ে পড়ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ স্বাক্ষর করার কারণে ভারত এবং ভিয়েতনামের মতো শক্তিশালী প্রতিযোগী দেশগুলো ইউরোপের বাজারে বিশেষ শুল্কমুক্ত ও অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা উপভোগ করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এই ধরনের কৌশলগত বাণিজ্য চুক্তির দিক থেকে এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে। একদিকে জ্বালানিসংকট, অন্যদিকে সুতা আমদানির নতুন বিধিনিষেধ এবং এর সাথে প্রতিযোগী দেশগুলোর অগ্রাধিকারমূলক চুক্তির সুযোগ—এই সবকিছু মিলে বৈশ্বিক দরকষাকষির টেবিলে বাংলাদেশকে ক্রমেই এক দুর্বল অবস্থানে ঠেলে দিচ্ছে।
শিল্প বিশ্লেষক ও শীর্ষ উদ্যোক্তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য আগামী একটি মাস অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণী এক সন্ধিক্ষণ হতে চলেছে। সুতা আমদানির ওপর আরোপিত এই কঠিন শর্ত ও ব্যাংক গ্যারান্টির বোঝা যদি সরকার অবিলম্বে প্রত্যাহার করে না নেয়, তবে যেসব আন্তর্জাতিক ক্রেতা বাংলাদেশে বড় বড় ক্রয়াদেশ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তারা কোনো দ্বিধা ছাড়াই সেইসব কাজ প্রতিযোগী ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত কিংবা পাকিস্তানে স্থানান্তর করে ফেলবেন। একবার কোনো বড় আন্তর্জাতিক ক্রেতা অন্য কোনো সরবরাহকারী দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করে ফেললে তাদের পুনরায় বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। তাই দেশের অর্থনীতির প্রধান এই স্তম্ভকে আন্তর্জাতিক মন্দা ও অভ্যন্তরীণ নীতিগত ফাঁদ থেকে রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে কাঁচামাল আমদানির সব বাধা অপসারণ করে একটি বাস্তবসম্মত ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেই সবচেয়ে জরুরি কাজ।
তথ্যসূত্র: দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড