শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩৯ অপরাহ্ন

অস্পষ্ট দৃষ্টি নিয়ে স্টিয়ারিংয়ে: ৬০% চালক জানতেনই না তাঁদের চোখে সমস্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১০ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬

সড়ক দুর্ঘটনা রোধ এবং দেশের গণপরিবহনের সাধারণ যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে চালকদের শারীরিক সুস্থতা ও দৃষ্টিশক্তির বিষয়টি অন্যতম প্রধান শর্ত হলেও বাস্তবে এ নিয়ে বরাবরই এক ধরনের নীরব ও মারাত্মক অবহেলা লক্ষ্য করা যায়। সম্প্রতি দেশের ১৯টি জেলার বিভিন্ন পরিবহন খাতের হাজার হাজার চালকের ওপর পরিচালিত একটি বৃহৎ চক্ষু পরীক্ষা কার্যক্রমে যে তথ্য বেরিয়ে এসেছে, তা দেশের সড়ক নিরাপত্তার ভঙ্গুর ও আতঙ্কজনক চিত্রকে নতুন করে উন্মোচন করেছে। আন্তর্জাতিক দৃষ্টি সেবা সংস্থা ‘ভিশনস্প্রিং বাংলাদেশ’-এর উদ্যোগে পরিচালিত এই বিশেষ হেলথ ক্যাম্পে অংশগ্রহণকারী চালকদের বিরাট অংশের চোখের গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, পরীক্ষার আওতায় আসা চালকদের প্রায় ৬০ শতাংশই জানতেন না যে তাঁদের দৃষ্টিশক্তিতে মারাত্মক সমস্যা রয়েছে এবং তাঁরা প্রথমবারের মতো চশমা ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছেন। চোখের এই নীরব ও সুপ্ত অসুস্থতা নিয়ে প্রতিনিয়ত ভারী যানবাহন বা যাত্রীবাহী বাস চালানোর ফলে প্রতিদিন শত শত সাধারণ মানুষের জীবন এক অপার্থিব ও অদৃশ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

গত বছরের অক্টোবর মাস থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ স্বাস্থ্য ক্যাম্পের কার্যক্রম চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অত্যন্ত সফলভাবে চলমান রয়েছে। বাস, মিনিবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের মতো বিভিন্ন ভারী ও হালকা যানবাহনের পেশাদার চালকদের চোখের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার জন্য এই অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভিশনস্প্রিং বাংলাদেশের তত্ত্বাবধানে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের মোট ১৯টি জেলা এবং সৈয়দপুর এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে এই হেলথ ক্যাম্পগুলো পরিচালিত হয়েছে। এই দেশব্যাপী কার্যক্রমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মোট ৩১ হাজার ৫৩৫ জন পেশাদার যানবাহনচালকের চোখ পরীক্ষা করা হয়েছে। অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান হলো, এই বিপুলসংখ্যক চালকের স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর প্রায় ৭৬ শতাংশ অর্থাৎ ২৪ হাজার ১০ জন চালককে তাৎক্ষণিকভাবে দৃষ্টিশক্তি সংশোধনের জন্য চশমা প্রদান করতে হয়েছে, যা দেশের পরিবহন শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত বিপর্যয়ের এক ভয়ংকর দলিল।

পরীক্ষায় অংশ নেওয়া চালকদের চোখের সমস্যাগুলো বিশ্লেষণ করে চিকিৎসকেরা দুই ধরনের প্রধান ত্রুটি চিহ্নিত করেছেন। চশমা প্রাপ্ত চালকদের মধ্যে প্রায় ৪৯ শতাংশের ক্ষেত্রে নিকটদৃষ্টি বা কাছাকাছি দেখার সমস্যা এবং ৫১ শতাংশের ক্ষেত্রে দূরদৃষ্টি বা অনেক দূরের বস্তু স্পষ্টভাবে দেখার অক্ষমতা ধরা পড়েছে। হাইওয়ে বা ব্যস্ত মহাসড়কে দ্রুতগতির যানবাহন চালানোর সময় চালকের দূরদৃষ্টির পরিষ্কার ক্ষমতা থাকা অত্যন্ত অপরিহার্য। কিন্তু সামান্য দূরত্ব থেকেও সংকেত বা অন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা স্পষ্টভাবে দেখতে না পাওয়ার মতো দৃষ্টি ত্রুটি নিয়ে তাঁরা বছরের পর বছর ধরে স্টিয়ারিং ধরে আসছিলেন। ভিশনস্প্রিং বাংলাদেশের ভিশন অ্যাকসেস প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক উম্মে সাউদা এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, সড়ক নিরাপত্তা কেবল উন্নত রাস্তাঘাট, ট্রাফিক সিগন্যাল বা আধুনিক যানবাহনের ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে চালকের নিজস্ব শারীরিক সক্ষমতা, বিশেষ করে তাঁর চোখের দৃষ্টি স্বচ্ছতার বিষয়টি ওয়ান টু ওয়ান জড়িত।

বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে পেশাদার চালকের নিজের চোখ ভালো না থাকলে তা কেবল তাঁর নিজের জীবনকেই বিপন্ন করে না, বরং গাড়িতে বসা শত শত যাত্রী এবং মহাসড়কে চলাচলকারী সাধারণ পথচারীর জীবনকেও নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। অথচ অসচেতনতা, অন্ধত্ব কিংবা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় চালকেরা নিজেরাও বুঝতে পারেন না যে তাঁদের দৃষ্টিশক্তি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে। ভিশনস্প্রিংয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষা করা চালকদের মধ্যে ১৪ হাজার ৬৪৬ জন বা প্রায় ৬০ শতাংশ এর আগে জীবনে কখনো চশমা ব্যবহার করেননি এবং ক্যাম্পের চিকিৎসকদের মাধ্যমে চোখ পরীক্ষা না করা পর্যন্ত তাঁরা সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন যে তাঁদের চোখের দৃষ্টিতে এমন বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠী বছরের পর বছর ধরে ঝাপসা চোখে স্টিয়ারিং সামলে আসছিলেন, যা আমাদের পরিবহন খাতের নজরদারির সম্পূর্ণ ব্যর্থতাকে স্পষ্ট করে।

এই ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে পরিবহন খাতকে মুক্ত করতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আরও বড় পরিসরে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সমিতির পক্ষ থেকে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সারা দেশে মোট ৫০ হাজার পেশাদার যানবাহনচালকের চোখ পরীক্ষা সম্পন্ন করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় কেবল দৃষ্টি পরীক্ষা ও বিনা মূল্যে চশমা বিতরণই নয়, বরং ছানি বা চোখের অন্য কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত চালকদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম এই উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরে জানিয়েছেন যে, চোখের মারাত্মক ত্রুটি বা দৃষ্টিহীনতা নিয়ে বাণিজ্যিক গাড়ি চালানো সম্পূর্ণ বেআইনি ও আত্মঘাতী অপরাধ। মালিক সমিতির পক্ষ থেকে এই মহৎ উদ্যোগে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে এবং চালকদের এই প্রাথমিক চক্ষুনিরীক্ষার পর তাদের সার্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ধাপে ধাপে আরও অন্যান্য মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করা হবে।

সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসের জন্য চালকদের নিয়মিত চোখের পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় চশমা ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট অভ্যাস গড়ে তোলার বিকল্প নেই। পরিবহন মালিক, শ্রমিক ইউনিয়ন, সরকারি নীতিনির্ধারক এবং বেসরকারি স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর সম্মিলিত অংশীদারত্ব ছাড়া এই বৃহৎ সংকট উত্তরণ অসম্ভব। একজন চালক যদি পরিষ্কার দেখতে না পান, তবে যতই ভালো ভালো প্রযুক্তি বা উন্নত সড়ক অবকাঠামো তৈরি করা হোক না কেন, দুর্ঘটনা রোধ করা কখনোই সম্ভব হবে না। তাই প্রতিটি লাইসেন্স নবায়নের সময় চোখের উন্নত ও বাধ্যতামূলক পরীক্ষা নিশ্চিত করা, পরিবহন কোম্পানির উদ্যোগে বছরে অন্তত একবার স্বাস্থ্য ক্যাম্প আয়োজন করা এবং চালকদের মধ্যে শারীরিক সচেতনতা বৃদ্ধি করাই এখন জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে বড় পূর্বশর্ত হওয়া উচিত।

তৃণমূল পর্যায়ে পেশাদার চালকদের সঠিক স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য দেশের প্রতিটি জেলা ও আঞ্চলিক পরিবহন মালিক সমিতির কার্যালয়ে স্থায়ী বা ভ্রাম্যমাণ হেলথ ডেস্ক গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় দিনমজুর ও পেশাদার চালকেরা জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন এত দীর্ঘ সময় একটানা গাড়ি চালান যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে চোখ পরীক্ষা করানোর সময় বা সামর্থ্য তাঁদের থাকে না। ফলে চোখের সামান্য ত্রুটি অবহেলা করতে করতে একসময় তা স্থায়ী অন্ধত্ব বা মারাত্মক দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভিশনস্প্রিং বাংলাদেশ ও পরিবহন মালিক সমিতির যৌথ এই উদ্যোগ তাই একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের উচিত এই সফল পাইলট কর্মসূচিটিকে একটি স্থায়ী জাতীয় নীতিমালায় রূপান্তর করা। শুধুমাত্র একবার চশমা বিতরণ করেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব নয়, কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখের লেন্সের ক্ষমতা পরিবর্তন হয়। তাই নিয়মিত বিরতিতে প্রতিটি চালকের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী লেন্স পরিবর্তন করার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নিরাপদ ও শৃঙ্খলিত করতে হলে চালকদের এই শারীরিক দুর্বলতাগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে অবিলম্বে কঠোর আইনি ও স্বাস্থ্যগত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ


এ জাতীয় আরো খবর...