মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং জাহাজে হামলার ঝুঁকির মধ্যে সরবরাহব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল করতে সিঙ্গাপুরে অপরিশোধিত তেল মজুত করার উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো।
সৌদি আরব ও সিঙ্গাপুরের জ্বালানিমন্ত্রীরা জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে সিঙ্গাপুরে অপরিশোধিত তেল মজুত শুরু করবে আরামকো। আঞ্চলিক পর্যায়ে কোম্পানিটির সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতা ও স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের প্রভাব এখনও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে তাদের সরবরাহব্যবস্থা নতুন করে সাজাতে হচ্ছে।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশের জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ক্ষেত্রে চলতি বছরের অক্টোবর সবচেয়ে খারাপ মাসে পরিণত হয়েছে। এসব হামলা জ্বালানি পরিবহনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে এবং তেল সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ আরও জটিল করেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পরিবহন করা হয়।
অন্যদিকে, বাব আল-মানদেব প্রণালিও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ দুটি জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তেল পরিবহনে বিলম্ব, জাহাজ চলাচলের ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সিঙ্গাপুরে তেল মজুতের সিদ্ধান্তকে সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি মোকাবিলায় আরামকোর একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এশিয়ার অন্যতম প্রধান জ্বালানি বাণিজ্যকেন্দ্র সিঙ্গাপুরে তেল সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী আঞ্চলিক বাজারে সরবরাহ পরিচালনা করা সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অস্থিরতা দেখা দিলে সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ সামাল দেওয়ার সুযোগও বাড়বে।
এদিকে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরোলও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সোমবার সিঙ্গাপুরে একটি শিল্পবিষয়ক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ২০২৭ সালেও জ্বালানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থায় ফিরে যাবে বলে তিনি মনে করেন না।
বিরোলের এ বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, সংঘাতের প্রভাব কেবল তাৎক্ষণিক সরবরাহসংকটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; জ্বালানি পরিবহন, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব দীর্ঘায়িত হতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক সৌদি আরবের জন্য এ পরিস্থিতিতে সরবরাহব্যবস্থার বিকল্প ও অতিরিক্ত সক্ষমতা গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। সিঙ্গাপুরে তেল মজুতের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় আরামকোর নমনীয়তা বাড়তে পারে।
তবে এ উদ্যোগ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা নির্ভর করবে সংঘাতের গতিপ্রকৃতি, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি পরিবহনে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকায় সৌদি আরামকোর সিঙ্গাপুরে তেল মজুতের পরিকল্পনা সরবরাহব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। একই সঙ্গে আইইএ প্রধানের সতর্কবার্তা ইঙ্গিত দিচ্ছে, সংঘাতের প্রভাব কাটিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে আগের অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।