শিরোনামঃ
মানবপাচারের মহোৎসব ও আমাদের দায় মিষ্টির শূন্য আসনে বিএনপি এলিজার মনোনয়নপত্র জমা সোনালী ব্যাংকের এমডি শওকত আলী খান পুনর্বহাল সিঙ্গাপুরে তেলের মজুত গড়বে সৌদি আরামকো ক্রসফায়ারের বক্তব্য প্রত্যাহার করে আইজিপির জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি টিআইবির চলতি বছরই ১ লাখ আনসার সদস্যকে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা: আনসার ডিজি দুই বছরের মধ্যে জেলা পর্যায়ে ক্যানসার চিকিৎসার রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপন: স্বাস্থ্যমন্ত্রী সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত গেলেন এনএসআই মহাপরিচালক দেশের মানুষ আপনার অপেক্ষায় আছে: হাসিনাকে দুলু রাষ্ট্রায়ত্ত ৩ ব্যাংকে নতুন এমডি নিয়োগ দিয়েছে সরকার
সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৭ অপরাহ্ন

মানবপাচারের মহোৎসব ও আমাদের দায়

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশের হাজারো পরিবারের কাছে ইউরোপের একটি ভিসা মানেই এক নতুন জীবনের স্বপ্ন—একটি স্থায়ী আয়ের উৎস, মাথা গোঁজার পাকা ঘর, দেনা মুক্তি আর সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ। এই সোনালী স্বপ্নের পেছনে বাজি ধরা হয় পরিবারের সর্বস্ব। পৈতৃক ভিটেমাটি বিক্রি করে, মায়ের শেষ সম্বল গহনাটুকু বন্ধক রেখে কিংবা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে একেকটি পরিবার তাদের তরুণ সন্তানকে প্রবাসে পাঠায়। এই যাত্রা কেবল একজন ব্যক্তির নয়, বরং পুরো একটি বংশের অস্তিত্বের বিনিয়োগ। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, সমৃদ্ধির সেই কাঙ্ক্ষিত মহাসড়ক অনেক সময়ই গিয়ে শেষ হয় লিবিয়ার কোনো অন্ধকার ডিটেনশন ক্যাম্পে কিংবা ভূমধ্যসাগরের অতল গহ্বরে।
এসব মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিকে কেবলই ভুক্তভোগীদের ‘উদাসীন বা হঠকারী সিদ্ধান্ত’ বলে চালিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এর পেছনে রয়েছে প্রতারণার এক সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি। মানবপাচারকারী চক্র মানুষের একটি উন্নত জীবনের আকুলতাকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। তারা এমন এক নিশ্চিত ভবিষ্যতের মিথ্যা আশ্বাস বিক্রি করে, যার আদতে কোনো অস্তিত্ব নেই; আর যাত্রার সমস্ত ঝুঁকি চাপিয়ে দেয় অসহায় মানুষগুলোর ওপর। মনে রাখা প্রয়োজন, স্বেচ্ছায় বিদেশ যাত্রা আর মানবপাচারের মধ্যে সুক্ষ্ম তফাত রয়েছে। কোনো ব্যক্তি যখন দালালের খপ্পরে পড়ে পাসপোর্ট হারায়, জিম্মি হয়ে মুক্তিপণের শিকার হয় কিংবা জোরপূর্বক শ্রম দিতে বাধ্য হয়, তখন তার সেই ‘স্বেচ্ছার’ যাত্রাটি একটি নির্মম অপরাধের রূপ নেয়। ভ্রমণের সম্মতি কখনোই শোষণের লাইসেন্স হতে পারে না।
প্রশ্ন উঠতে পারে, সরকারি এত সতর্কবার্তা সত্ত্বেও কেন মানুষ এই মরণফাঁদে পা দেয়? প্রথমত, দেশের অভ্যন্তরে মানসম্মত কর্মসংস্থানের অভাব, অপর্যাপ্ত মজুরি এবং উচ্চশিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের অমিল তরুণদের দেশত্যাগে বাধ্য করে। দ্বিতীয়ত, আমাদের সমাজে প্রবাসীদের এক ধরণের সামাজিক মর্যাদা রয়েছে। সফল প্রবাসীদের দৃশ্যমান জৌলুস সবাই দেখে, কিন্তু আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় ব্যর্থতার গ্লানি। যারা ফিরে আসেন, তারা ভূগছেন ডিটেনশন ক্যাম্পের নির্যাতন, অমানুষিক ঋণ আর অপমানের স্তব্ধতায়। আর যারা নিখোঁজ হন, তারা তো কখনো আর ফিরে এসে বলতে পারেন না ভূমধ্যসাগরের সেই নয় দিনের ভয়াবহ তৃষ্ণা ও ক্ষুধার গল্প। এই অসম অভিজ্ঞতার কারণে দালালের চটকদার প্রচারণাই সমাজে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়। উপরন্তু, স্থানীয় দালালরা সাধারণত পাড়া-প্রতিবেশী বা আত্মীয় হওয়ায় তাদের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে মরণফাঁদে রূপ নেয়।
এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে বাংলাদেশকে কেবল সমুদ্রতীরবর্তী পাহারায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। পাচারের এই আন্তর্জাতিক চেইনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আঘাত করতে হবে। গ্রাম পর্যায়ের খুদে দালালকে গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়; বরং ডিজিটাল যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন এবং ব্যাংকিং রেকর্ড ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে মূল অর্থদাতা, ভুয়া নথিপত্র তৈরিকারী ও আন্তর্জাতিক চক্রের হোতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব বা সামাজিক প্রতিপত্তি যেন কোনো অপরাধীর বর্ম না হতে পারে। একই সাথে, ভুক্তভোগীদের কেবল পুনর্বাসন নয়, তাদের আইনি সুরক্ষা, মানসিক চিকিৎসা ও পুনরায় জীবিকা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে।
সর্বোপরি, ইউরোপে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কোনো অপরাধ নয়, কিন্তু মানুষের এই স্বপ্নকে জিম্মি করে দাসত্ব ও মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া এক জঘন্য অপরাধ। যে সমাজ ও রাষ্ট্র প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে টিকে আছে, সেই সমাজকে তাদের জীবন ও মর্যাদার সুরক্ষার দায়ও নিতে হবে। ভূমধ্যসাগরে ভেসে ওঠা প্রতিটি বাংলাদেশির মরদেহ আমাদের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই দায় কেবল শোক প্রকাশের নয়, বরং পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার এখনই সময়।


এ জাতীয় আরো খবর...