রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর যেকোনো রাজনৈতিক দলের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায় অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা এবং নেতাকর্মীদের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা। কিন্তু ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বর্তমানে তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় স্তরের নেতাকর্মীদের লাগাম টানতে গিয়ে যে দৃশ্যমান সংকটের মুখে পড়েছে, তা কেবল দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং জাতীয় জীবনের সামগ্রিক স্বস্তির ওপর গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আইন অমান্য করার প্রবণতা, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন সহিংস কর্মকাণ্ডের কারণে দফায় দফায় বহিষ্কার, স্থগিতাদেশ ও কমিটি ভেঙে দেওয়ার মতো কঠোর সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে শীর্ষ নেতৃত্বকে। কিন্তু এসব শাস্তিমূলক পদক্ষেপের পরও যে পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে না, বরং প্রতিদিন কোনো না কোনো নেতিবাচক খবরে জনজীবন বিঘ্নিত হচ্ছে, তা এক বড় সতর্কবার্তা।
সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত জারি করা ১৭টি শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে ৭১ জন নেতাকর্মীকে বহিষ্কার এবং একজনকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে চারটি ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। দলের দায়িত্বশীল সাংগঠনিক নেতৃত্ব এসব শাস্তিকে দলকে শৃঙ্খলিত রাখার নিয়মিত প্রয়াস বলে দাবি করলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। বহিষ্কার কিংবা সাময়িক সতর্কবার্তার মতো ব্যবস্থাগুলো কর্মীদের লাগামহীন আচরণ ঠেকাতে কার্যকর কোনো ফল আনতে পারছে না। উল্টো দলীয় সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে অমান্য করা, রক্তক্ষয়ী অন্তর্কোন্দল এবং নিজেদের আইনি এখতিয়ার অতিক্রম করে সাধারণ মানুষের ওপর ক্ষমতার অনৈতিক প্রভাব খাটানোর প্রবণতা প্রায় প্রতিদিনের স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তা স্পষ্ট হয়েছে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া শীর্ষ পর্যায়ের দুটি ঘটনার মধ্য দিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছে, কারণ তিনি রাজধানীর একটি মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে প্রকাশ্যে নিজের বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করে চরম বিতর্কের জন্ম দেন। বৈধ অস্ত্র কেবল আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহারের আইনি বিধান থাকলেও একজন দায়িত্বশীল প্রতিমন্ত্রীর এমন আচরণ আইনের শাসনের প্রতি স্পষ্ট অবজ্ঞা ও ক্ষমতার দম্ভেরই বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে, রাজধানীর মিরপুরে একটি পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সংঘটিত ন্যক্কারজনক হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হওয়ায় সংরক্ষিত নারী আসনের একজন সংসদ সদস্যকেও পদত্যাগ করতে হয়েছে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী ফোরাম ও আইনসভার সদস্যদের এমন চরম দায়িত্বহীন আচরণ প্রমাণ করে, ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি ঠিক কতটা বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছেছে।
একই ধরনের বিশৃঙ্খলা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট গ্রাস করেছে দলের অন্যতম প্রধান সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকেও। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে তথাকথিত ‘সুপার ফাইভ’ নেতৃত্ব বছরের পর বছর ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছে। দীর্ঘমেয়াদে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বহাল থাকার সুযোগ নিয়ে মুষ্টিমেয় কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা পুরো ক্যাম্পাস রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের ব্যক্তিগত অনুগত গোষ্ঠীর হাতে তুলে দিচ্ছেন। এই প্রবণতা বিগত পতিত আওয়ামী লীগ শাসনামলের সেই পরিচিত ব্যক্তিকেন্দ্রিক পৃষ্ঠপোষকতা, আধিপত্য বিস্তার ও ক্যাম্পাস দখলের সংস্কৃতিকেই নতুন করে জাতির সামনে মনে করিয়ে দেয়। নতুন ও সম্ভাবনাময় তরুণ কর্মীদের রাজনীতিতে বিকশিত হওয়ার স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ করে যখন কেবল ব্যক্তিস্বার্থে সংগঠন পরিচালিত হয়, তখন অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও অপরাধপ্রবণতা ছড়িয়ে পড়া অনিবার্য হয়ে ওঠে।
দলীয় নেতাকর্মীদের এমন লাগামহীন আচরণ শুধু একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ সুনামই ক্ষুণ্ন করে না, বরং গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিনষ্ট করে। যখন রাজনৈতিক পরিচয়ে সন্ত্রাস, দখলদারি ও চাঁদাবাজি সাধারণ নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে আঘাত হানে, তখন আইনের শাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে সমাজে গভীর প্রশ্ন ওঠে। দল ও সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বকে বুঝতে হবে, মুখে কঠোর হুঁশিয়ারি কিংবা কেবল দু-একটি লোকদেখানো বহিষ্কারাদেশ দিয়ে এই ব্যাধির স্থায়ী নিরাময় সম্ভব নয়। দল ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর প্রতিটি স্তরে যেকোনো ধরনের সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে শৃঙ্খলার কঠোর শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ক্ষমতার দাপট দেখানো ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, আইনের চোখে সবাইকে সমান বিবেচনা করে যথাযথ প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।