রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২২ পূর্বাহ্ন

অগ্নিকাণ্ড ও আমাদের দায়বদ্ধতা: বারবার মৃত্যুর পরও কি ঘুম ভাঙবে না?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ বার
প্রকাশ: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

কক্সবাজারের ইনানীতে একটি পর্যটন রিসোর্টে আগুনে পুড়ে একই পরিবারের ছয়জনসহ দশটি তাজা প্রাণের মর্মান্তিক অঙ্গার হওয়ার দৃশ্য যেন আমাদের জাতীয় বিবেককে আবারও এক নিদারুণ কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মাত্র কদিন আগেই চকবাজারের মার্কেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আগুন নেভানোর যুদ্ধ কিংবা শিল্পাঞ্চলের রাসায়নিক কারখানায় ভস্মীভূত হওয়া জীবনের আর্তনাদ যখন বাতাসে মিলিয়ে যেতে না যেতেই নতুন এক ট্র্যাজেডি এসে উপস্থিত হয়, তখন একে নিছক ‘দুর্ঘটনা’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ থাকে না। আমাদের দেশে অগ্নিকাণ্ড এখন আর কোনো আকস্মিক বিপর্যয় নয়; বরং এটি ধারাবাহিক অবহেলা, অনিয়ম এবং সামগ্রিক দায়হীনতার এক নিয়মতান্ত্রিক পরিণতিতে রূপ নিয়েছে।

ইনানীর পর্যটন রিসোর্টের ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে আমাদের সার্বিক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপটি উন্মোচিত হয়। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, প্রতিষ্ঠানটির কোনো বৈধ ফায়ার লাইসেন্সই ছিল না। কয়েক মাস আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিদর্শনে গিয়ে চরম ঝুঁকির কথা জানিয়ে নোটিশ দিলেও রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ তা নির্বিকারভাবে উপেক্ষা করেছে। বাঁশ, কাঠ ও টিন দিয়ে তৈরি অতিদাহ্য একটি দোতলা স্থাপনার নিচতলায় রেস্তোরাঁ ও ওপরের তলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, অথচ ছিল না কোনো প্রাথমিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা বা বিকল্প জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি। মুনাফার অন্ধ মোহে মানুষের অমূল্য জীবনকে এভাবে জিম্মি করার এই মানসিকতাই মূলত একেকটি অগ্নিকাণ্ডকে কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডে রূপ দিচ্ছে।

তবে দায় কেবল এই এক রিসোর্ট বা কোনো একক কারখানা মালিকের নয়। বছরের পর বছর ধরে পর্যটন এলাকাগুলো থেকে শুরু করে খোদ রাজধানীর আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে শত শত অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা গড়ে উঠছে কার ছত্রছায়ায়? নিয়ম অনুযায়ী কঠোর নজরদারি, নিয়মিত তদারকি এবং শর্ত না মানলে অবিলম্বে কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার যে আইনি এখতিয়ার প্রশাসনের রয়েছে, তার প্রয়োগ কোথায়? কোনো একটি বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার পর শোক প্রকাশ, ক্ষতিপূরণের আশ্বাস আর দায়সারা তদন্ত কমিটি গঠনের চেনা ছকের ভেতরেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সেই তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। প্রশাসনিক গাফিলতি ও তদারকির এই চরম অভাবই অপরাধীদের বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়।

এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে আমাদের নিজেদের দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিও এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। বাড়ি নির্মাণ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালু কিংবা দৈনন্দিন বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা কতটা সচেতন? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সামান্য খরচ বাঁচাতে নিম্নমানের তার, ত্রুটিপূর্ণ গ্যাস সংযোগ কিংবা অনুমোদনহীন নকশায় ভবন তৈরি করা হচ্ছে। নিজ বাসাবাড়ি বা কর্মস্থলে একটি প্রাথমিক ফায়ার এক্সটিঙ্গুইশার রাখা কিংবা জরুরি সময়ে কীভাবে নিরাপদে বের হতে হবে—সে বিষয়ে ন্যূনতম মহড়া বা প্রস্তুতি নেওয়ার তাগিদ আমরা নাগরিক হিসেবে খুব কমই অনুভব করি। আইন অমান্য করার এই সাধারণ সংস্কৃতি এবং ‘আমার কিছু হবে না’ ভেবে উদাসীন থাকার মনোভাবও সামগ্রিক ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সড়ক কিংবা পর্যটনকেন্দ্রে মানুষ ছুটে যায় জীবনের একটু স্বস্তি আর আনন্দের খোঁজে; ছাই হয়ে বাড়ি ফেরার জন্য নয়। প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এক একটি পরিবারের আজীবনের কান্না। এই প্রাণঘাতী চক্র থেকে বের হতে হলে সবার আগে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। যেসব ভবন বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছাড়া বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে, কালবিলম্ব না করে সেগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয় জোরদার করে নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকি নিশ্চিত করা আবশ্যক। একই সঙ্গে মালিকপক্ষ এবং সাধারণ নাগরিক—সবার মধ্যেই নিরাপত্তা বিধিমালার প্রতি নিঃশর্ত শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হতে হবে। জীবনের চেয়ে বড় কোনো ব্যবসা হতে পারে না। আর কোনো অগ্নিকাণ্ডে স্বজন হারানোর হাহাকার দেখতে না চাইলে আজই আমাদের এই সম্মিলিত উদাসীনতা ও অবহেলার ইতি টানতে হবে।


এ জাতীয় আরো খবর...