মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৯ পূর্বাহ্ন

অরক্ষিত নাগরিক তথ্য ও ডিজিটাল নিরাপত্তার গভীর খাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা একটি আধুনিক ডিজিটাল সমাজ ও অর্থনীতির অন্যতম মৌলিক ভিত্তি| কিন্তু বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত গ্রাহক তথ্যের ধারাবাহিক ফাঁসের ঘটনা প্রমাণ করছে যে, নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পতিত হয়েছে| সম্প্রতি রাইড শেয়ারিং, পার্সেল, কুরিয়ার এবং আর্থিক সেবাদাতা প্ল্যাটফর্ম ‘পাঠাও’-এর প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ গ্রাহক ও কর্মীর সংবেদনশীল তথ্য ডার্ক ওয়েবে বিক্রির উদ্দেশ্যে তুলে ধরার যে অভিযোগ এসেছে, তা দেশের তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তার ভঙ্গুর দশাকে আবারও নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে| ডার্ক ওয়েবের এক হ্যাকার চক্র এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ না করার শর্তে প্রায় ৪ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৫ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছে| সাইবার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, চুরি হওয়া ১৩৩ গিগাবাইটের এই বিশালাকার ডেটাসেটে নাগরিকদের ফোন নম্বর, ইমেইল ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরের মতো সাধারণ তথ্যের পাশাপাশি পাসওয়ার্ড হ্যাশ, সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান বা জিপিএস ট্র্যাকিং রেকর্ড, সংরক্ষিত ফেসবুক টোকেন, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং অন্তত ১৭ হাজার মার্চেন্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ৮ লাখ ডাইরেক্ট ডেবিট রেকর্ড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে| একজন নাগরিকের আর্থিক ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য এর চেয়ে বড় প্রত্যক্ষ হুমকি আর কিছু হতে পারে না|
উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন সর্বনাশা তথ্য ফাঁসের ঘটনা দেশে এবারই প্রথম নয়; বরং এটি প্রায় নিয়মিত একটি দুর্যোগে পরিণত হয়েছে| মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে গত সেপ্টেম্বরে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ‘ঘরের বাজার’-এর ছয় লক্ষাধিক গ্রাহকের প্রোফাইল ডার্ক ওয়েব ফোরামে বিক্রির জন্য তোলা হয়| এর আগের মাসে চাকরির পোর্টাল ‘বিডিজবস’-এর কোটি কোটি জীবনবৃত্তান্ত বা সিভি চুরির দাবি করে একই ধরনের হ্যাকার চক্র, যদিও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি তা নিছক গুজব বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল| একই ধারাবাহিকতায় সুপারশপ চেইন ‘স্বপ্ন’, রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর ‘টেলিটক’ এবং খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দপ্তরের তথ্যভান্ডারও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সাইবার অপরাধীদের কবলে পড়েছে| এসব ঘটনা স্পষ্ট নির্দেশ করে যে, তথ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরকারি বা বেসরকারি কোনো খাতের প্রস্তুতিই গ্রহণযোগ্য মাত্রায় নেই|
তথ্য ফাঁসের ঘটনা প্রকাশ্যে এলে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাই থাকে অত্যন্ত দায়সারা ও প্রতিক্রিয়াশীল| সাধারণত ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর অভ্যন্তরীণ তদন্ত, বিশেষজ্ঞ দল নিয়োগ কিংবা থানায় সাধারণ ডায়েরি বা মামলা করার আনুষ্ঠানিকতা দেখিয়ে পরিস্থিতি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়| কোনো কোনো ক্ষেত্রে দায় পুরোপুরি অস্বীকার করে নিজেদের দুর্বলতাকে আড়াল করা হয়, যা ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ পুনরাবৃত্তির পথকে উন্মুক্ত রাখে| সাইবার অপরাধীরা প্রতিনিয়ত নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেঙে সিস্টেমে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে| এমন পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তিগত অজ্ঞতা, দুর্বল অভ্যন্তরীণ নীতিমালা এবং আধুনিক এনক্রিপশন ব্যবস্থার অভাব হ্যাকারদের কাজকে সহজ করে তুলছে|
এই সংকটের মূলে রয়েছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অপ্রয়োজনীয় ও লাগামহীন তথ্য সংগ্রহের প্রবণতা| সামান্য কোনো নাগরিক সেবা দিতে গিয়ে গ্রাহকের সার্বক্ষণিক জিপিএস লোকেশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাক্সেস এবং আর্থিক অ্যাকাউন্টের স্পর্শকাতর তথ্য সংগ্রহ করার মতো আগ্রাসী চর্চায় মেতে রয়েছে বহু করপোরেট প্রতিষ্ঠান| অথচ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়ম হলো ‘ডাটা মিনিমাইজেশন’—অর্থাৎ কোনো সেবা দিতে যতটুকু তথ্যের একান্ত প্রয়োজন, তার বাইরে বাড়তি কোনো তথ্য সংরক্ষণ না করা| এই অতিরিক্ত ডেটা সুরক্ষার প্রয়োজনীয় কারিগরি বিনিয়োগ না করে তা অরক্ষিতভাবে সার্ভারে ফেলে রাখায় লাখ লাখ নাগরিক আজ প্রতারণা, পরিচয় চুরি বা আইডেন্টিটি থেফট এবং ব্ল্যাকমেইলের ঝুঁকিতে পড়ছেন|
এখন সময় এসেছে আত্মতুষ্টির খোলস ভেঙে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের| কেবল কাগুজে সতর্কবার্তা দিয়ে এই ডিজিটাল বিশৃঙ্খলা বন্ধ করা সম্ভব নয়| সরকারকে কালবিলম্ব না করে একটি আন্তর্জাতিক মানের ও কঠোর ‘উপাত্ত সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে তথ্য ফাঁসের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিপুল অঙ্কের আর্থিক জরিমানা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তির মুখোমুখি করার স্পষ্ট বিধান থাকবে| একই সঙ্গে যেসব পাবলিক ও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ নাগরিক তথ্য ধারণ করে, তাদের জন্য নিয়মিত স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ দ্বারা ‘সাইবার সিকিউরিটি অডিট’ সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক করতে হবে| তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের প্রতিটি স্তরে আধুনিক এনক্রিপশন, কঠোর অভ্যন্তরীণ প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং তথ্য মুছে ফেলার গ্রাহক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে| রাষ্ট্রের নাগরিকদের তথ্য সুরক্ষিত রাখা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও নাগরিক মর্যাদার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত| যদি এখনই কার্যকর ও কঠোর আইনি প্রতিরক্ষা প্রাচীর গড়ে না তোলা যায়, তবে কোটি কোটি নাগরিকের জীবন ডিজিটাল দুনিয়ায় সম্পূর্ণ অরক্ষিত ও পণবন্দি হয়ে থাকবে|


এ জাতীয় আরো খবর...