বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৭ পূর্বাহ্ন

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে ভর্তুকির বিকল্প নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২ বার
প্রকাশ: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬

দেশের কৃষিখাত ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে সেচ ও কৃষিকাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ডিজেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি। গত ২১ সেপ্টেম্বর সরকার প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে এক লাফে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। কৃষিকাজ, খাদ্য উৎপাদন এবং জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় এর নেতিবাচক প্রভাব কতটা ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী হতে পারে, তা যেন একপ্রকার এড়িয়েই গেছেন সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা। এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে এই দাম বাড়ানো হলো, যখন সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে সারের চড়া দাম, সেচের পানির সংকট এবং বীজের লাগামহীন ঊর্ধ্বমুখী মূল্যের কারণে কৃষকরা আগে থেকেই চরম মানসিক ও আর্থিক চাপে রয়েছেন। এর পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত বঞ্চনা তো রয়েছেই। অর্থনীতি ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে সতর্ক করে বলেছেন যে, জ্বালানি তেলের এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলকে চরম অস্থিতিশীল করে তুলবে। মূল্যস্ফীতি এবং ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচের চাপে আগে থেকেই ধুঁকতে থাকা কৃষিখাতের জন্য সরকারের এই সিদ্ধান্ত এক বিশাল অশনিসংকেত। জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার হয়তো কৃষিখাতে নিজেদের ভর্তুকির বিশাল আর্থিক বোঝা সাময়িকভাবে কিছুটা কমাবে, কিন্তু এই অস্থিতিশীলতার চূড়ান্ত ও নির্মম মাশুল গুনতে হবে দেশের আপামর জনসাধারণকে।
অর্থনীতির সাধারণ সূত্র ও বাজার বাস্তবতা অনুযায়ী, জ্বালানির দাম বাড়লে এর ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কৃষির প্রতিটি স্তরে। ব্যক্তি মালিকানাধীন সেচ পাম্পের মালিকরা নিজেদের মুনাফার মার্জিন ঠিক রাখতে এই বাড়তি খরচের পুরো দায়ভার অত্যন্ত সুকৌশলে চাপিয়ে দেবেন প্রান্তিক কৃষকের ঘাড়ে। পণ্য পরিবহনকারী ট্রাক মালিক এবং বীজের খুচরা বিক্রেতারাও একই পথে হাঁটবেন। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বেন দেশের উত্তরাঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকার অসহায় কৃষকরা। ওইসব অঞ্চলে সেচ দেওয়া, জমি প্রস্তুত করা, ফসল কাটা এবং মাড়াই করার জন্য ডিজেলচালিত শ্যালো পাম্প ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ওপর কৃষকরা পুরোপুরি নির্ভরশীল। এই দমবন্ধ করা অবস্থায় কৃষকদের পক্ষে তাদের আবাদ চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে, যদি না রাষ্ট্র উৎপাদকদের জন্য বিশেষ কোনো আর্থিক সুরক্ষাবলয়ের ব্যবস্থা করে। অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়লে উৎপাদিত ফসলের দামও আনুপাতিক হারে বাড়া উচিত। কিন্তু আমাদের বাজার ব্যবস্থার নির্মম বাস্তবতা হলো, ফসল ঘরে ওঠার পর হঠাৎ সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার খোঁড়া অজুহাতে মধ্যস্বত্বভোগীরা সিন্ডিকেট করে ফসলের দাম কমিয়ে দেয়, ফলে কৃষকরা কখনোই তাদের ন্যায্যমূল্য পান না।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্কের ‘অ্যাগ্রিকালচারাল বাজেটিং ইন বাংলাদেশ: ট্রেন্ডস, প্রায়োরিটিজ অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক আউটলুক ২০২৬’ শীর্ষক একটি গবেষণায় দেশের কৃষিখাতের এক ভয়াবহ ও অন্ধকার চিত্র উঠে এসেছে। ওই গবেষণায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রতিনিয়ত কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি এবং সম্পূর্ণ অস্থিতিশীল বাজারব্যবস্থা কৃষকদের মুনাফাকে একেবারে তলানিতে নিয়ে ঠেকিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জ্বালানি, সার, কীটনাশক, সেচ ও কৃষি শ্রমিকের মজুরি অস্বাভাবিক হারে বাড়ার কারণে শুধু বোরো ধানের উৎপাদন খরচই এক লাফে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এই অসহনীয় পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে অনেক প্রান্তিক কৃষক বাধ্য হয়ে চড়া সুদে ঋণ নিচ্ছেন অথবা স্থানীয় মহাজন ও জমির মালিকদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু ফসল বিক্রির পর তারা তাদের আসল উৎপাদন খরচটুকুও তুলতে পারছেন না। ফলে তারা এমন এক ভয়ংকর ঋণের ফাঁদে আটকা পড়ছেন, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় তাদের সামনে খোলা থাকছে না। এই ধারাবাহিক লোকসানের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে অনেক প্রান্তিক কৃষক বাধ্য হয়ে কৃষিকাজ ছেড়েই দিচ্ছেন, যা একটি কৃষিপ্রধান অর্থনীতির দেশের জন্য চরম লজ্জার ও উদ্বেগের।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, উৎপাদন খরচের এই চরম ঊর্ধ্বগতি যদি কৃষকদের চাষাবাদ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তবে তার চূড়ান্ত পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ ও অকল্পনীয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে হতাশ হয়ে যদি দেশের মাত্র ১০ শতাংশ কৃষকও এক মৌসুমের জন্য তাদের কৃষিকাজ বা আবাদ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন, তবে দেশে খাদ্যের তীব্র হাহাকার দেখা দেবে এবং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা চরম হুমকিতে পড়বে। সাধারণ মানুষের খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে তখন সরকারকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে চড়া দামে খাদ্য আমদানি করতে হবে। তাই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের উচিত অবিলম্বে এই হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা। দেশের কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং সার্বিক খাদ্য সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সরকারকে অবশ্যই ডিজেলের এই বর্ধিত মূল্য অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। দেশের প্রাণ কৃষকদের বাঁচিয়ে রাখা এবং কৃষিখাতকে টেকসই করার স্বার্থে কৃষিবান্ধব নীতি গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।


এ জাতীয় আরো খবর...