রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৮ অপরাহ্ন

সংকুচিত আয়ের খাত প্রয়োজন টেকসই সংস্কার

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬

দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক ভয়াবহ ক্রান্তিকাল ও গভীর অনিশ্চয়তার আবর্তে নিপতিত। একদিকে রাজস্ব আদায়ে ধারাবাহিক নিম্নমুখী প্রবণতা, অন্যদিকে বিনিয়োগ খরায় দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা এবং সরকারি ব্যয়ের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি—সব মিলিয়ে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে রাষ্ট্র। দৈনন্দিন রাষ্ট্রীয় ব্যয় ও ক্রমবর্ধমান রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে গিয়ে সরকারকে প্রতিনিয়ত অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হচ্ছে। অর্থের এই বিশাল শূন্যতা পূরণে কেবল ঋণ গ্রহণ কখনোই কোনো টেকসই বা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমাধান হতে পারে না, এটি অর্থনীতির একটি সর্বজনীন সত্য। বরং, ঋণ পরিশোধের নিজস্ব সক্ষমতা না থাকা এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের চরম অনুপস্থিতি জাতীয় অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে এক ভয়ংকর ও অন্ধকার ঋণফাঁদের দিকে ধাবিত করছে। একটি রাষ্ট্রের আয়ের প্রধান উৎস যখন সংকুচিত হয়ে আসে এবং ব্যয়ের খাতা স্ফীত হতে থাকে, তখন সামষ্টিক অর্থনীতি তার স্বাভাবিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।

অর্থনীতির এই নাজুক, ভঙ্গুর ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি একদিনে বা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। বিগত সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বছরের পর বছর ধরে অপরিকল্পিতভাবে দেশি-বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে, যার সিংহভাগই যথাযথ উৎপাদনশীল বা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহৃত হয়নি। মেগা প্রকল্পের নামে অবাধ লুটপাট, লাগামহীন আর্থিক অপচয়, দুর্নীতি এবং অপ্রয়োজনীয় খাতে অকাতরে ব্যয় বৃদ্ধির ফলে আজকের এই পর্বতপ্রমাণ পুঞ্জীভূত সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। জবাবদিহিহীনতার সেই সংস্কৃতির অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ সরকারের নিজস্ব আয়ের খাতগুলো ক্রমেই সংকুচিত ও ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, অপরিকল্পিতভাবে নেওয়া সেই পুঞ্জীভূত ঋণের বিশাল কিস্তি এবং চক্রবৃদ্ধি সুদের দায় মেটাতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার কার্যত শূন্য হয়ে পড়ছে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ার এই বিপজ্জনক প্রবণতা সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এক বিশাল অশনিসংকেত, যা থেকে উত্তরণের পথ অত্যন্ত কঠিন ও কণ্টকাকীর্ণ।

এই চরম সঙ্গিন অবস্থা থেকে দেশকে উদ্ধার করতে হলে কালক্ষেপণ না করে সরকারকে অবিলম্বে দ্রুত, কঠোর ও গঠনমূলক নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সবার আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে হবে। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে যাবতীয় প্রশাসনিক ফাঁকফোকর ও দুর্নীতির পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে করের পরিধি বাড়ানোকেই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। রাজস্ব আদায়ে অবাস্তব ও কাল্পনিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করার পুরনো প্রথা থেকে বেরিয়ে এসে কর কাঠামোর যুগোপযোগী ও বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিকায়ন অত্যন্ত জরুরি। সেই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বকেয়া রাজস্ব উদ্ধারে সরকারকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। করদাতাদের ওপর অহেতুক চাপ না বাড়িয়ে, যারা কর জালের বাইরে রয়েছেন তাদের করের আওতায় আনতে হবে।

অনুৎপাদনশীল খাত কিংবা কেবল রাজনৈতিক চমক দেখানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া অনাবশ্যক অবকাঠামোগত প্রকল্পে ঢালাওভাবে বিদেশি ও দেশীয় ঋণ নেওয়ার প্রবণতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ঋণ থেকে সংগৃহীত প্রতিটি পয়সা যেন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির মতো প্রত্যক্ষ উৎপাদনমুখী খাতে ব্যবহৃত হয়, সেটি যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অহেতুক নতুন প্রকল্প গ্রহণ কিংবা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ানোর বদলে চলমান প্রকল্পগুলোর গুণগত মূল্যায়ন ও কঠোর ব্যয় সংকোচন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। পাশাপাশি, রাষ্ট্রীয় সম্পদের কার্যকর ও লাভজনক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে কিছু সাহসী ও যুগান্তকারী অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। যেসব সরকারি অবকাঠামো বা প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে অলাভজনক কিংবা যাদের পরিচালনা ব্যয় অত্যধিক, সেগুলোর পরিচালন দায়িত্ব বা শেয়ার বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার মাধ্যমে সরকারের হাতে তাৎক্ষণিক তারল্য বা নগদ অর্থ আনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারি খাতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা দুর্নীতি ও আর্থিক অপচয় কঠোর হাতে দমন করা ছাড়া অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার প্রত্যাবর্তন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তবে ঋণের সুদের বিপুল ভার মেটাতে গিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কিংবা উন্নয়ন বাজেটের মৌলিক জনকল্যাণমূলক খাতগুলো যেন কোনোভাবেই সংকুচিত না হয়, সেদিকেও সরকারকে তীক্ষ্ণ মনোযোগ দিতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রা ও রিজার্ভের ওপর থেকে ক্রমবর্ধমান চাপ কমাতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং তৈরি পোশাকের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণে দূরদর্শী ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর শর্ত মেনে কেবল সাময়িক স্বস্তির জন্য তড়িঘড়ি করে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সুশাসন ও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর নজর দেওয়া এখন বেশি জরুরি। শ্রীলঙ্কা বা ঘানার মতো দেশগুলোর ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের এই স্পষ্ট শিক্ষাই দেয় যে, সময়মতো প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্কার, ঋণের যৌক্তিক পুনর্গঠন এবং রাজস্ব বাড়ানোর কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি যেকোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় বাস্তবতায় একটি গতিশীল, স্বনির্ভর ও টেকসই অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন প্রশাসনিক সততা, ঋণের যৌক্তিক ব্যবহার এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। সরকার অবিলম্বে এসব সুদৃঢ় সংস্কারমূলক পদক্ষেপের দিকে অগ্রসর হয়ে অর্থনীতিকে সামাল দেওয়ার একটি সঠিক ও টেকসই পথ উন্মোচন করবে, দেশের আপামর জনসাধারণের এটাই ঐকান্তিক প্রত্যাশা।


এ জাতীয় আরো খবর...