বাংলাদেশের বর্তমান নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর এক নতুন ও মারাত্মক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ‘কিশোর গ্যাং’ বা কিশোর অপরাধী চক্রের সর্বগ্রাসী বিস্তার। সম্প্রতি পুলিশের এক জরিপে যে ভয়ংকর চিত্র উঠে এসেছে, তা যেকোনো সচেতন নাগরিকের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলার জন্য যথেষ্ট। গত ২৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত পুলিশের আগস্ট মাসের অপরাধ পর্যালোচনা সভার তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বর্তমানে অন্তত ৩৮৫টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে এবং এগুলোর সাথে সরাসরি জড়িত রয়েছে তিন হাজারের বেশি কিশোর। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, খোদ রাজধানী ঢাকাতেই ১৫৮টি এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ৯৮টি গ্যাং দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য মেট্রোপলিটন শহর ও ছোট ছোট মফস্বল শহরগুলোতেও ডজন ডজন কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে। পুলিশের মতে, তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ এখনো চলমান থাকায় গ্যাং এবং এর সদস্যদের প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বহুগুণ বেশি হতে পারে। এই বিপুল পরিসংখ্যান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সমস্যাটি এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নেই, বরং এটি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক ভয়াবহ ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
এই কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর বর্তমান পদক্ষেপগুলো যে একেবারেই অপর্যাপ্ত, তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে নির্মমভাবে হত্যার পর পুলিশ কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে বিশেষ অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের এক হাজার ৭৩৮ জন সদস্যকে আটক করেছে। অতীতেও এমন কোনো চাঞ্চল্যকর ও মর্মান্তিক অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর কিছুদিন এ ধরনের ধরপাকড় বা বিশেষ অভিযান পরিচালিত হতে দেখা গেছে। কিন্তু সাময়িক এই অভিযানগুলো সমস্যার শিকড় উৎপাটনে কখনোই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। কারণ, যে রাজনৈতিক ও অপরাধ জগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজেদের হীন স্বার্থে এই কিশোরদের পেশিশক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে, তারা সব সময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে থাকা গডফাদার, পৃষ্ঠপোষক, অর্থদাতা এবং সংগঠকদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে এই গ্যাং কালচার বা অপরাধের চক্র কোনোভাবেই ভেঙে দেওয়া সম্ভব নয়।
এই গ্যাংগুলো মূলত সংঘবদ্ধ অপরাধী নেটওয়ার্ক এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে এদের অপরাধের মাত্রা সাধারণ গণ্ডি পেরিয়ে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক ব্যবসা, নারীদের উত্ত্যক্ত করা থেকে শুরু করে ভাড়ায় মানুষ খুন করা পর্যন্ত গড়িয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, কেন আমাদের কিশোররা এই ভয়ংকর অন্ধকারের পথে পা বাড়াচ্ছে? এর প্রধান কারণ হলো রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় ও সংবেদনশীল পদক্ষেপের অভাব। বিশেষ করে দারিদ্র্য ও পারিবারিক বন্ধনের অভাব কিশোর গ্যাংয়ে জড়ানোর অন্যতম প্রধান নিয়ামক। যে সমস্ত কিশোর রাস্তায় বড় হয় কিংবা যাদের মাথার ওপর কোনো অভিভাবক নেই, অপরাধী চক্রগুলো খুব সহজেই অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের এই অন্ধকার জগতে টেনে আনে।
কিশোর গ্যাংয়ের এই ভয়াবহ চক্র থেকে তরুণ সমাজকে বের করে আনতে হলে প্রয়োজন একটি সামগ্রিক, সুদূরপ্রসারী এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। কিশোররা কেন এই ধরনের গ্যাংয়ের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে অপরাধের চরম পর্যায়ে যাওয়ার আগেই তাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। আইনের সংঘাতে জড়ানো শিশু-কিশোরদের বিচার ও সংশোধনের জন্য আমাদের দেশে ‘শিশু আইন ২০১৩’-এর মতো একটি বিশেষ আইনি কাঠামো রয়েছে, যার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা একান্ত জরুরি। পাশাপাশি, স্কুল ও কলেজগুলোকে তাদের শিক্ষার্থীদের আচরণের প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী যদি ক্রমাগত ক্লাসে অনুপস্থিত থাকে কিংবা তার আচরণে যদি হঠাৎ কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়, তবে তা দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে একটি কার্যকর মনিটরিং মেকানিজম গড়ে তুলতে হবে। এর পাশাপাশি পরিবারগুলোকেও তাদের সন্তানদের মেলামেশা ও চলাফেরার ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
পরিশেষে, দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত ও বিপথগামী এই তরুণদের জন্য রাষ্ট্রকে অবশ্যই উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কিশোরদের অফুরন্ত প্রাণশক্তিকে যদি খেলাধুলা, সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা, সৃজনশীল কাজ এবং কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নের মতো ইতিবাচক খাতে প্রবাহিত করা যায়, তবে গ্যাং কালচারের এই ভয়ংকর হাতছানি থেকে তাদের সহজেই দূরে রাখা সম্ভব। কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো বা অপরাধস্থলে ধরা পড়া কিশোরদের গণ্ডি পেরিয়ে এর পেছনের মূল হোতাদের খুঁজে বের করতে হবে এবং তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। যেহেতু কিশোর অপরাধ একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়, তাই এটিকে কেবল শক্তি প্রয়োগ করে নয়, বরং সর্বোচ্চ সংবেদনশীলতা, মনস্তাত্ত্বিক পরিচর্যা ও সামাজিক পুনর্বাসনের মাধ্যমেই মোকাবিলা করতে হবে।