সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৭ পূর্বাহ্ন

বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ জরুরি

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর সপ্তাহ না ঘুরতেই দেশের নিত্যপণ্যের বাজার চরম অস্থিতিশীল ও লাগামহীন হয়ে উঠেছে। জ্বালানির এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যক্ষ প্রভাবে নতুন করে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির যে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তা ইতোমধ্যেই বাস্তব রূপ নিতে শুরু করেছে। এই ঊর্ধ্বমুখী বাজারের উত্তাপে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দেশের স্বল্প ও নির্দিষ্ট আয়ের প্রান্তিক মানুষ। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কোনো সামঞ্জস্য না থাকায় মাসের সাধারণ খরচের হিসাব মেলানো এখন মধ্যবিত্তের জন্যও এক কঠিন ও নিরন্তর সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। বরাবরের মতোই দেশের একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কোনো ধরনের নিয়ম-নীতি ও নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে। বাজারে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর যদি কঠোর ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অব্যাহত থাকত, তবে ব্যবসায়ীদের এই অনৈতিক আস্ফালন কোনোভাবেই সম্ভব হতো না।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মূল্যস্ফীতির সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক বাজার-অভিজ্ঞতার কোনো বাস্তব সংগতি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিবিএসের পরিসংখ্যান বলছে, গত আগস্ট মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি আগের জুলাইয়ের ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে কিছুটা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পরিসংখ্যানে এই স্বস্তির আভাস থাকলেও বাস্তবে বাজারে সাধারণ ক্রেতারা বিন্দুমাত্র স্বস্তি পাচ্ছেন না। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ এই নয় যে বাজারে পণ্যের দাম কমে গেছে; এর প্রকৃত অর্থ হলো দাম বাড়ার গতি আগের চেয়ে কিছুটা মন্থর হয়েছে। মূল্যস্ফীতি সামান্য কমার পরও বাজারে পণ্যের দাম না কমে উচ্চ অবস্থানে আটকে থাকার মূল কারণ হিসেবে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্তর, উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটি এবং বাজার সিন্ডিকেট ও পরিবহন চাঁদাবাজির মতো দীর্ঘদিনের জিইয়ে থাকা সমস্যাগুলোই সরাসরি দায়ী।

অর্থনীতির ভাষায়, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি একটি অত্যন্ত ‘ছোঁয়াচে’ বিষয়। কৃষি উৎপাদন, সেচব্যবস্থা থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে এর প্রত্যক্ষ খরচ যুক্ত হয়। তেলের দাম এক ধাক্কায় ২০ টাকা বাড়ানোর পর আটা, ময়দা, খোলা ভোজ্যতেল, সবজি, চাল ও ডিমসহ প্রাত্যহিক জীবনের জন্য অপরিহার্য প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম এখন ঊর্ধ্বমুখী। জ্বালানির দাম বাড়লে আনুপাতিক হারে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমানে গুরুতর অভিযোগ উঠছে যে, পণ্যবাহী পরিবহনগুলোতে জ্বালানি খরচের আনুপাতিক হারের চেয়ে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক হারে ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে। সুযোগসন্ধানী ও অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধিকে একটি মোক্ষম হাতিয়ার ও অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ভোক্তাদের আক্ষরিক অর্থেই জিম্মি করে ফেলেছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রেখে দাম নিয়ন্ত্রণের নানামুখী আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্রে তার কোনো ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

বাজার তদারকিতে চরম প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সংস্থাগুলোর মধ্যকার সমন্বয়হীনতার কারণেই অসাধু চক্রের এই বেপরোয়া কারসাজি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে লোকদেখানো যে সামান্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয় বা যৎসামান্য জরিমানা করা হয়, তা এই সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী অসাধু সিন্ডিকেটকে থামানোর জন্য একেবারেই অপ্রতুল। মূলত এই দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়েই মজুতদার ও ফড়িয়ারা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতি মুনাফা লুটে নিচ্ছে।

উদ্ভূত এই জনদুর্ভোগের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে শুধু বুলি সর্বস্ব মৌখিক আশ্বাসের বৃত্ত থেকে অবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে। পণ্য পরিবহন ভাড়া যেন কোনোভাবেই অন্যায্য ও ইচ্ছামাফিক বাড়ানো না হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু খুচরা বাজারে অভিযান চালালে হবে না, বরং কৃষকের উৎপাদিত ফসলের মাঠ থেকে শুরু করে পাইকারি আড়ত এবং চূড়ান্ত ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি স্তরে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্ছিদ্র ও নিয়মিত করতে হবে। পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের রাজনৈতিক বা অন্য কোনো পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে সার্বিক মূল্যস্ফীতি যেন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে সম্পূর্ণভাবে বিপন্ন করে না তোলে, সে বিষয়ে সরকারকে এখনই একটি সমন্বিত ও কার্যকর বাজার নিয়ন্ত্রণ কৌশল বাস্তবায়ন করতে হবে।


এ জাতীয় আরো খবর...