শিরোনামঃ
শ্রমিক হত্যা ও অগ্নিনিরাপত্তায় গাফিলতি: অবহেলার সংস্কৃতি বন্ধ হোক বিএনপির মনোনয়ন ফরম বিতরণ শুরু শুক্রবার দেশ ও সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্টের ষড়যন্ত্র চলছে: রিজভী সামুদ্রিক অর্থনীতির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর জোর নৌমন্ত্রীর স্থাপত্যশৈলী অক্ষুণ্ন রেখে সংসদ ভবনে সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ আগামী পাঁচ বছরে ৩ হাজার শিক্ষককে পিএইচডি অর্জনে সহায়তা দেবে ইউজিসি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি গঠন স্থগিত আইনগত সহায়তার মাধ্যমে ন্যায়বিচারের পথ সুগম করতে হবে: আইনমন্ত্রী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উন্নয়নকাজের আইনি বাধা দূর হয়েছে: অ্যাটর্নি জেনারেল ৪৫তম বিসিএসে ১,৭০২ জনের নিয়োগ, গেজেট প্রকাশ
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৩ পূর্বাহ্ন

শ্রমিক হত্যা ও অগ্নিনিরাপত্তায় গাফিলতি: অবহেলার সংস্কৃতি বন্ধ হোক

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশের শিল্প খাতে, বিশেষ করে কলকারখানায় অগ্নিকাণ্ডের মর্মান্তিক ঘটনাগুলো বারবার প্রমাণ করছে যে, এ দেশে শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি এখনো চরম অবহেলিত। পর্যায়ক্রমিক সরকারগুলো কারখানা মালিক ও ব্যবস্থাপকদের আইনি জবাবদিহির আওতায় আনতে চরমভাবে ব্যর্থ হওয়ায় শিল্পক্ষেত্রে সার্বিক নিরাপত্তা, বিশেষ করে অগ্নিনিরাপত্তা আজ এক বিরাট জাতীয় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে ঢাকায় আনোয়ার ওয়্যারহাউসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন নিরীহ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, এই মর্মান্তিক ঘটনার পুলিশি তদন্ত আজও শেষ হয়নি। গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, ওয়্যারহাউসের মালিক—যিনি এই মামলার প্রধান অভিযুক্ত—নিহতদের অসহায় পরিবারকে সামান্য অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে আইনি দায়বদ্ধতা এড়ানোর অপচেষ্টা করছেন। যদিও অভিযুক্ত মালিক এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন, তবুও পুলিশের তদন্তের দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। অথচ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে, সেখানে অগ্নিনিরাপত্তার চরম অবহেলা ও মারাত্মক গাফিলতি ছিল। অবৈধভাবে বিপজ্জনক রাসায়নিক মজুত করা এবং ছাদে যাওয়ার একমাত্র দরজাটি তালাবদ্ধ রাখার কারণেই মূলত আটকে পড়া শ্রমিকরা মুক্ত বাতাসে বের হতে পারেননি এবং ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে করুণভাবে প্রাণ হারান।

আনোয়ার ওয়্যারহাউসের আশপাশের এলাকার শ্রমিকদের অভিযোগ, অনেক কারখানাই এখনো শিফট শেষ না হওয়া পর্যন্ত মূল গেটে তালা দিয়ে রাখে। এই ধরনের অমানবিক ও বেআইনি চর্চা শ্রমিকদের যেকোনো অগ্নিকাণ্ডের সময় নিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে। জবাবদিহির এই নিদারুণ অভাব কারখানা মালিকদের বিনা শাস্তিতে নিরাপত্তা বিধিমালা লঙ্ঘনের অবাধ সুযোগ করে দিচ্ছে, আর সাধারণ ও গরিব শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত শিকার হচ্ছেন প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর।

শিল্প কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় সীমাহীন বিলম্ব এবং সামান্য অর্থের বিনিময়ে আদালতের বাইরে মীমাংসা করার অপচেষ্টা এখন যেন এ দেশের এক নিয়মিত ও ঘৃণ্য রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। ২০২১ সালের জুলাইয়ে হাশেম ফুডস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৫৪ জন শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটে। সেখানেও একই মর্মান্তিক চিত্র দেখা গেছে, অনেকেই তালাবদ্ধ দরজার কারণে বের হতে না পেরে পুড়ে ছাই হয়েছেন। সেই ভয়াবহ ঘটনার পরও মালিকপক্ষ নিহতদের পরিবারের চরম অর্থনৈতিক অসহায়ত্বের নির্লজ্জ সুযোগ নিয়ে আইনি দায়বদ্ধতার বদলে সামান্য আর্থিক সহায়তা দিয়ে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

তাজরীন ফ্যাশনসের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এবং রানা প্লাজা ধসে হাজারেরও বেশি শ্রমিকের প্রাণহানির পর আন্তর্জাতিক ও দেশীয়ভাবে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখনো যেসব তৈরি পোশাক কারখানা বড় ও সুপরিচিত কোনো ব্যবসায়ী সংগঠনের সদস্য নয়, সেগুলো সম্পূর্ণ নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে। একইভাবে তৈরি পোশাক খাত বাদে অন্যান্য শিল্প খাতগুলোও এই তদারকি প্রক্রিয়ার একেবারেই বাইরে রয়ে গেছে। সরকার ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে কেবল আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সন্তুষ্ট করতে রপ্তানিমুখী শিল্পের কমপ্লায়েন্স বা কমপ্লায়েন্সের ওপর জোর দিয়ে আসছে। আর অন্যদিকে সস্তাশ্রমের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য শিল্প খাতের প্রতি তারা পুরোপুরি চোখ বন্ধ করে আছে, যা চরম বৈষম্যমূলক।

প্রতিবারই যখন কোনো কারখানায় আগুন লাগে, তখন সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা কেবল আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেন এবং তদন্তের ফাঁকা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করেন। কিন্তু বাস্তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো দুর্নীতি, এখতিয়ারের দ্বন্দ্ব এবং চরম জনবল সংকটে জর্জরিত। তাই শ্রমিক নেতারা যখন বুকফাটা আর্তনাদ করে বলেন যে, কারখানায় বারবার আগুনে পুড়ে শ্রমিকের মৃত্যু কোনো নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি এক ধরনের অবহেলার কারণে সুস্পষ্ট ও কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড—তখন তাদের এই দাবিকে কোনোভাবেই অমূলক বা অতিরঞ্জিত বলা যায় না।

সরকারের এখনই সময় এসেছে এই ধরনের অবহেলার বিরুদ্ধে একটি কঠোর আইনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করার। আনোয়ার ওয়্যারহাউসের মালিক ও অন্যান্য ব্যবস্থাপকদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন করে বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই কঠোর বার্তা দেওয়া উচিত যে, কোনো কারখানা মালিকই দেশের প্রচলিত আইনের ঊর্ধ্বে নন। একই সঙ্গে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চরম ব্যর্থতার বিষয়টিও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। কীভাবে আনোয়ার ওয়্যারহাউসের মতো একটি নন-কমপ্লায়েন্ট বা ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের জীবন বাজি রেখে এতদিন ধরে প্রকাশ্য দিবালোকে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল, তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের অমূল্য জীবনের চেয়ে কারখানার মালিকের মুনাফা কখনো বড় হতে পারে না। এই অমানবিক অবহেলার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।


এ জাতীয় আরো খবর...