কক্সবাজারের ইনানীতে সৈকতসংলগ্ন মেরিন ড্রাইভের একটি রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন পর্যটকের মর্মান্তিক মৃত্যু কেবল একটি হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনাই নয়, বরং আমাদের জাতীয় বিবেক ও পর্যটন ব্যবস্থাপনার মুখে এক নির্মম চপেটাঘাত। ছুটি কাটাতে এসে ভস্মীভূত হয়ে নিথর দেহে ফিরে যাওয়ার এই বিভীষিকা যেন স্পষ্ট করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্রটি আজ কতটা অরক্ষিত, বিশৃঙ্খল এবং ভয়ংকর এক মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। যে সমুদ্রের অপার রূপ ও নীল জলরাশি মানুষকে মানসিক প্রশান্তি দেওয়ার কথা ছিল, মুনাফালোভী মহলের লাগামহীন নৈরাজ্যে তা আজ মৃত্যুফাঁদে রূপ নিয়েছে। স্বজনহারা পরিবারের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠা বাতাস এখন একটাই প্রশ্ন তুলছে—এই কাঠামোগত অবহেলা ও হত্যাকাণ্ডের দায় কার?
বিশ্বের দীর্ঘতম নিরবচ্ছিন্ন বালুকাময় সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার বহু বছর ধরেই তার প্রাকৃতিক লাবণ্য হারাচ্ছে। নাগরিক সুবিধা ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার তোয়াক্কা না করে শহরজুড়ে চলেছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পাহাড় নিধন এবং জলাশয় ভরাট। লাবণী, সুগন্ধা কিংবা কলাতলী সৈকতের দিকে তাকালে এখন আর প্রকৃতির উদার রূপ চোখে পড়ে না; বরং সর্বত্র চোখে পড়ে ভ্রাম্যমাণ দোকান, হকার, বিচ বাইক ও ঘোড়ার দৌরাত্ম্য। সৈকত যেন পরিণত হয়েছে এক কোলাহলপূর্ণ সস্তা বাজারে। একই চিত্র মেরিন ড্রাইভেও। অপরিকল্পিত পার্কিং, যানজট এবং সৈকতজুড়ে প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তূপ এখন এখানকার নৈমিত্তিক দৃশ্য। প্রকৃতির স্বাভাবিক নীরবতা ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে বাণিজ্যিক অরাজকতার রাজত্ব।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন বা ইসিএ ঘোষিত এলাকায় বেপরোয়া নির্মাণযজ্ঞ। গত তিন দশকে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কক্সবাজারের স্পর্শকাতর এলাকায় ৭০০টিরও বেশি বহুতল ভবন গড়ে তোলা হয়েছে, যার মধ্যে পাঁচ শতাধিকই বাণিজ্যিক হোটেল ও রিসোর্ট। পরিবেশ অধিদপ্তরের খতিয়ান অনুসারেই জানা যায়, এই বিপুলসংখ্যক স্থাপনার মধ্যে মাত্র ৪৫টির পরিবেশ ছাড়পত্র রয়েছে এবং বর্জ্য পরিশোধনের আধুনিক ব্যবস্থা বা এসটিপি রয়েছে মাত্র ১৪টিতে। বাকি শত শত হোটেলের অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য ও বিষাক্ত তরল সরাসরি গিয়ে মিশছে সাগরের নীল জলে। মেরিন ড্রাইভের দুই পাড়ে নির্বিচারে ঝাউবাগান কেটে রিসোর্ট বানানোর ফলে সামুদ্রিক মা কাছিম ও লাল কাঁকড়ার বংশবৃদ্ধির প্রাকৃতিক আশ্রয় চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
ইনানীর অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত রিসোর্টটি এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও সীমাহীন দুর্নীতিরই একটি জ্বলন্ত নমুনা। জানা গেছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই অবৈধভাবে এটি পরিচালনা করা হচ্ছিল। ইতিপূর্বে নোটিশ জারি ও নামমাত্র জরিমানা করা হলেও রিসোর্টটির কার্যক্রম কখনোই বন্ধ করা হয়নি। একইভাবে মেরিন ড্রাইভজুড়ে এমন শতাধিক অবৈধ রিসোর্ট প্রশাসনের নাকের ডগায় বুক ফুলিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রভাবশালীদের রাজনৈতিক চাপ আর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তার কারণে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখে না। নিয়মবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানকে শুধু কাগুজে নোটিশ দিয়ে আর নামমাত্র জরিমানা করে দায় সারার এই অপসংস্কৃতিই কার্যত ১০ জন নিরপরাধ মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার পথ প্রশস্ত করেছে।
একটি সুস্থ পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার জন্য প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। বিশ্বের অন্যান্য দেশ যেখানে উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষায় কঠোর পরিবেশ আইন বাস্তবায়ন করে, সেখানে আমরা কক্সবাজারকে অবহেলা ও লোভের ভাগাড়ে পরিণত করেছি। এই অরাজকতার অবিলম্বে অবসান ঘটাতে হবে। মেরিন ড্রাইভ ও সৈকতসংলগ্ন সংরক্ষিত অঞ্চলের সব অবৈধ স্থাপনা কোনো অজুহাত ছাড়াই গুঁড়িয়ে দিতে হবে। প্রতিটি হোটেল ও রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং নাগরিক সুবিধা কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
কক্সবাজারকে রক্ষার নামে বছরের পর বছর অনেক প্রতিশ্রুতি আর মাস্টারপ্ল্যানের বুলি আওড়ানো হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। ইনানীর এই অগ্নিকাণ্ড শেষ সতর্কবার্তা। আর একটিও নিরীহ প্রাণের অপচয় হওয়ার আগেই যদি কক্সবাজারকে বাঁচাতে সমন্বিত ও আপসহীন পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে বিশ্বের বৃহত্তম এই সমুদ্রসৈকত তার অস্তিত্ব হারিয়ে ইতিহাসের পাতায় কেবল একটি ব্যর্থতার স্মারক হয়ে থাকবে।