একবিংশ শতাব্দীর এই ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তি আমাদের জীবনযাত্রাকে যেমন সহজ করে তুলেছে, তেমনি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও তথ্যের সুরক্ষাকে এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। সম্প্রতি জনপ্রিয় কনজ্যুমার টেক অ্যাপ ‘পাঠাও’-এর প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ ব্যবহারকারীর বিশদ ব্যক্তিগত তথ্য ডার্ক ওয়েবে ফাঁস হওয়ার যে চাঞ্চল্যকর সংবাদ গণমাধ্যমে এসেছে, তা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন কারিগরি ত্রুটি নয়, বরং আমাদের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তার ভঙ্গুর কাঠামোর এক ভয়ানক চিত্র। সাইবার ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফর্মের তথ্যমতে, হ্যাকার চক্রটি পাঠাওয়ের সার্ভার থেকে প্রায় ১৩৩ জিবি ডেটা চুরির দাবি করেছে, যার মধ্যে রয়েছে গ্রাহক ও কর্মচারীদের ফোন নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের নম্বর, পাসওয়ার্ড হাশ, জিপিএস লোকেশন, ফেসবুক অ্যাক্সেস টোকেন, এমনকি কয়েক লাখ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ডিরেক্ট ডেবিট রেকর্ড। চার লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় পৌনে পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা না দিলে এই বিশাল সংবেদনশীল তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করার হুমকি দিয়েছে ওই সাইবার অপরাধীরা। প্রশ্ন হলো, ডিজিটাল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্যের এই অবাধ বিচরণের যুগে নাগরিকদের গোপনীয়তার ন্যূনতম নিরাপত্তা আসলে কোথায়।
অবশ্য দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এই ধরনের তথ্য চুরির ঘটনা বাংলাদেশে এটিই প্রথম বা একমাত্র নয়। গত সেপ্টেম্বর মাসে ই-কমার্স সাইট ‘ঘরের বাজার’-এর ছয় লাখের বেশি গ্রাহকের প্রোফাইল ডার্ক ওয়েবের নিলামে উঠেছিল। এর আগে আগস্ট মাসে দেশের শীর্ষস্থানীয় জব পোর্টাল ‘বিডিজবস’-এর কোটি কোটি চাকরিপ্রার্থীর জীবনবৃত্তান্ত বা সিভির তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার দাবি করেছিল আরেক হ্যাকার চক্র, যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তখন বিষয়টি হালকাভাবে উড়িয়ে দিয়েছিল। এছাড়া রিটেল চেইন শপ ‘স্বপ্ন’, রাষ্ট্রীয় মোবাইল অপারেটর ‘টেলিটক’ কিংবা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংবেদনশীল তথ্যও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিভিন্ন সাইবার অপরাধের ফোরামে প্রকাশ পেয়েছে। তথ্য বেহাল হওয়ার পর অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হয় দায়সারাভাবে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদারের লোকদেখানো প্রতিশ্রুতি দেয়, কিংবা পুরো ঘটনাটিকেই অস্বীকার করে পার পাওয়ার অপচেষ্টা চালায়। এই ধরনের দায়িত্বহীন করপোরেট সংস্কৃতি সাইবার অপরাধীদের আরও বেশি উৎসাহিত করে এবং বারবার এই ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে বাধ্য হয়।
সাইবার অপরাধীরা সবসময় আধুনিক প্রযুক্তির দুর্বলতার সুযোগ নিতে প্রস্তুত থাকে, তাই কেবল দায় সেরে চুপ থাকলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহকারী প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি কঠোর অভ্যন্তরীণ নীতি প্রণয়ন করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহের বদভ্যাস থেকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে এবং ডেটা মিনিমাইজেশন বা ন্যূনতম তথ্য সংরক্ষণের নীতি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। একই সঙ্গে তথ্য চুরির ঝুঁকি কমাতে গ্রাহকদের তথ্যের গোপনীয়তার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। তবে কেবল করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে নাগরিকদের ডেটা সুরক্ষা নিশ্চিত করা কখনোই সম্ভব নয়, এর জন্য রাষ্ট্র ও সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
সবচেয়ে বড় সংকট হলো, আমাদের দেশে এখনো নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্য যুগোপযোগী ও কঠোর কোনো ডেটা প্রাইভেসি আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে অবিলম্বে নাগরিকদের ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা এবং বাধ্যতামূলক কমপ্লায়েন্স আইন প্রণয়ন করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি ও নৈতিক দায়িত্ব। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি গ্রাহকের তথ্যের সুরক্ষায় নগ্ন অবহেলা করে কিংবা তথ্য ফাঁসের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি শাস্তির দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা এবং সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে আপসহীন ও দৃশ্যমান অবস্থান নেওয়ার মাধ্যমেই কেবল ডিজিটাল অর্থনীতির ওপর মানুষের আস্থার ভিত মজবুত করা সম্ভব।