শিরোনামঃ
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে যুক্তরাষ্ট্রের কারিগরি সহায়তা চান খাদ্যমন্ত্রী সৃজনশীল শিল্পকে মূলধারার অর্থনীতি ও সফট পাওয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার: অর্থমন্ত্রী প্রলয়ংকরী যুদ্ধের হুঁশিয়ারি ইরানের, ঝুঁকিতে উপসাগরীয় দেশগুলো দুর্নীতি মামলায় আনিসুল হকসহ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ ইলিয়াস আলী গুমের মামলায় উইং কমান্ডার সাইফুর রহমান ট্রাইব্যুনালে রুমির হাতে ‘চড় খাওয়া’ সেই মাদ্রাসাশিক্ষকের জামিন নামঞ্জুর বিএনপি জাতির সঙ্গে ধাপ্পাবাজি করেছে: শফিকুর রহমান জামায়াতের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা ফুটপাত দখলমুক্ত করার পাশাপাশি পুর্নবাসন করা হবে: রাসিক প্রশাসক মেট্রোরেল স্টেশনগুলোতে আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম স্থাপনের সিদ্ধান্ত
রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩৯ অপরাহ্ন

নাগরিক সেবায় গলদ যখন গোড়াতেই: অপরিকল্পিত ডিজিটালাইজেশনের খেসারত

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬

নাগরিক সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা, হয়রানি এবং দুর্নীতির অচলাবস্থা এ দেশের সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। জন্মনিবন্ধন সংশোধন থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ বা গ্যাসের বিলের সামান্য বিরোধ নিষ্পত্তি—প্রতিটি পদক্ষেপে টেবিল থেকে টেবিলে ধরনা দেওয়া এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা যেন নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রশাসনিক সংস্কার ও জনভোগান্তি লাঘবের যে স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালের মে মাসে এক ছাতার নিচে সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ বা সমন্বিত একক সেবা কেন্দ্র চালুর উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ নেয়। লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন দপ্তরের অন্তত সাড়ে চারশত নাগরিক সেবাকে একটি অভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে একীভূত করা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, গোড়ায় গলদ এবং অপরিকল্পিত বাস্তবায়নের কারণে এই মহতী উদ্যোগটি পাইলট বা পরীক্ষামূলক পর্যায়েই পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়েছে।

সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সরেজমিন প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য প্রকল্পটির অকার্যকারিতার এক হতাশাজনক চিত্র উন্মোচিত করেছে। পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া ছয়টি কেন্দ্রের প্রায় সবগুলোই কার্যত নিষ্ক্রিয় ও অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) ও ডাক বিভাগের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের চত্বরে স্থাপিত কেন্দ্রগুলোর মধ্যে চারটিতেই ঝুলছে তালা, আর অন্য একটি কেন্দ্র মাঝেমধ্যে খোলা হলেও সেখানে সেবাগ্রহীতাদের কোনো উপস্থিতি নেই। মাত্র বারোটি সেবা—যার মধ্যে জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো গুটিকয়েক কাজ অন্তর্ভুক্ত—কোনোমতে চালু করা সম্ভব হয়েছে। সরকারের মোট ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাছে সেবাকে সমন্বিত করার প্রস্তাব পাঠানো হলেও মাত্র এক ডজনের মতো বিভাগ এতে সাড়া দিয়েছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের এই চরম ঘাটতি প্রমাণ করে যে, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কার্যকর অংশগ্রহণ ও সম্মতি নিশ্চিত না করেই কেবল ওপর থেকে চাপিয়ে দিয়ে এই প্রকল্প শুরু করা হয়েছিল। ফলে শুরুতেই এটি তার যৌক্তিক প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীন ‘অ্যাসপায়ার টু ইনোভেট’ (এটুআই) প্রকল্পটির বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকলেও তাদের পরিকল্পনায় কাঠামোগত দুর্বলতা ছিল স্পষ্ট। কোনো নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ কিংবা আইনি রূপরেখা ছাড়াই কেবল অভ্যন্তরীণ পরিচালনার ওপর ভরসা করে এত বড় প্রকল্প টেকসই হতে পারে না—এ কথা খোদ এটুআই-ও এখন পরোক্ষভাবে স্বীকার করছে। সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি হলো, দেশজুড়ে যেখানে ইতোমধ্যেই প্রায় ৯ হাজার ৫০০টি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার বিদ্যমান, সেখানে নতুন করে আরেকটি সমান্তরাল অবকাঠামো গড়ে তোলার যৌক্তিকতা বা তহবিল অপচয়ের ঝুঁকি নিয়ে কোনো পূর্বমূল্যায়নই করা হয়নি। তদুপরি, এই ওয়ান-স্টপ সেন্টারের কর্মীদের আবেদনপত্র গ্রহণ করা ছাড়া সেগুলোর নিষ্পত্তি বা অনুমোদন করার কোনো প্রশাসনিক এখতিয়ার দেওয়া হয়নি। ফলে নাগরিকদের দিনশেষে আবারও সেই পুরোনো আমলাতান্ত্রিক টেবিলেই ছুটতে হচ্ছে, যা ওয়ান-স্টপ ধারণার মূল চেতনারই পরিপন্থী। পরিচালনাকারীদের কোনো নির্দিষ্ট বেতন ছিল না, অথচ আসবাব ও আধুনিক সরঞ্জামের পেছনে গচ্চা গেছে বিপুল অর্থ। এখন প্রকল্প চালুর পর সমন্বয়ের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা কার্যত ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার শামিল।

প্রস্তুতিহীনতা ও টেকসই ব্যবস্থার অভাবে ডিজিটাল উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার এমন নজির বাংলাদেশে এটিই প্রথম নয়। অতীতের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ডিজিটাল ডাকঘরের নামে কেনা কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কখনো প্যাকেটই খোলা হয়নি, কিংবা অনেক কেন্দ্র উদ্বোধনই হতে পারেনি। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থাপিত শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবগুলোও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগের অভাব এবং যন্ত্রপাতির সুরক্ষার অভাবে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। রাজনৈতিক চমক সৃষ্টি বা বাহবা কুড়ানোর উদ্দেশ্যে তড়িঘড়ি করে এমন অসম্পূর্ণ ও লোকদেখানো প্রকল্প চালুর প্রবণতা রাষ্ট্রীয় অর্থের বিপুল অপচয়ের পাশাপাশি জনগণের প্রত্যাশার ওপরও চরম আঘাত হানে।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উচিত এই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তাদের সামগ্রিক কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা ঢেলে সাজানো। কোনো সেবা ডিজিটালাইজড করার অর্থ কেবল একটি চকচকে কক্ষ বা কম্পিউটার স্থাপন করা নয়, বরং এর পেছনে দপ্তরগুলোর আন্তঃসংযোগ, কর্মীদের বেতন ও জবাবদিহিতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা। সস্তা জনপ্রিয়তার মোহ ত্যাগ করে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্ত না করা পর্যন্ত নতুন কোনো প্রকল্প যেন চাপিয়ে দেওয়া না হয়। রাষ্ট্রীয় তহবিলের অপচয় বন্ধ করে এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের মাধ্যমেই কেবল প্রকৃত জনবান্ধব নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।


এ জাতীয় আরো খবর...