বাংলাদেশের জাতীয় মাছ রূপালি ইলিশের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি এবং প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রতি বছর সরকার ঘোষিত মা ইলিশ সংরক্ষণের বাইশ দিনের নিষেধাজ্ঞা এবং জাটকা নিধনের ওপর দুই মাসের কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এর সুফল নিয়ে গভীর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মৎস্যবিজ্ঞানীদের সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত ও গবেষণার ওপর ভিত্তি করে প্রণীত বিভিন্ন সংরক্ষণ কর্মসূচির কারণে বিগত দুই দশকে দেশে ইলিশের সামগ্রিক আহরণ দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, সেই ধারাবাহিক বৃদ্ধির রেকর্ডে বড় ধরনের ছেদ পড়েছে এবং টানা দুই অর্থবছর ধরে ইলিশের জাতীয় উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ে সরকারি নিষেধাজ্ঞার কঠোর বাস্তবায়নে প্রশাসনিক দুর্বলতা রয়েছে নাকি নদীর মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয় ইলিশের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে, তা নিয়ে মৎস্য গবেষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র সংশয় তৈরি হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানের দিকে নজর দিলে উৎপাদনের এই উদ্বেগজনক পতনের চিত্রটি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তথ্যানুযায়ী, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশের সামগ্রিক উৎপাদনের পরিমাণ ছিল দুই লাখ পঞ্চান্ন হাজার আট শ উনচল্লিশ মেট্রিক টন। যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন নদ-নদী থেকে আহরিত হয়েছিল একাত্তর হাজার মেট্রিক টন এবং সামুদ্রিক জলসীমা থেকে এসেছিল এক লাখ চুরাশি হাজার আট শ সাঁইত্রিশ মেট্রিক টন। পরবর্তী দুই দশকে সরকারের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও বিজ্ঞানসম্মত বিভিন্ন পদক্ষেপের কল্যাণে ইলিশের উৎপাদন প্রতি বছর এক থেকে আট শতাংশ পর্যন্ত চক্রবৃদ্ধি হারে বৃদ্ধি পায়। এর সুবাদে ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরণের পরিমাণ সর্বকালের রেকর্ড ভেঙে পাঁচ লাখ একাত্তর হাজার তিন শ বিয়াল্লিশ মেট্রিক টনে গিয়ে পৌঁছায়।
উৎপাদনের এই ঐতিহাসিক সাফল্যের ধারা হঠাৎ করেই হোঁচট খায় পরবর্তী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। সেই সময়ে আগের বছরের তুলনায় উৎপাদন শতকরা সাত দশমিক তিন তিন শতাংশ হ্রাস পেয়ে নেমে আসে পাঁচ লাখ ঊনত্রিশ হাজার চার শ সাতাশি মেট্রিক টনে। উৎপাদন হ্রাসের এই ধারা এখানেই থেমে থাকেনি, বরং সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও ইলিশের মোট আহরণ আরও কমে প্রায় পাঁচ লাখ মেট্রিক টনের নিচে নেমে গেছে। পরপর দুই বছর জাতীয় মাছের উৎপাদনে এমন ধারাবাহিক ধস নামার কারণে মৎস্য মন্ত্রণালয় এবং গবেষণা মহলে নতুন করে শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই এখন কেবল কাগজে-কলমে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রকাশ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব প্রকাশ করছেন।
ইলিশের বিজ্ঞানসম্মত জীবনচক্র ও বংশবৃদ্ধির জন্য মূলত মা ইলিশকে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ প্রদান এবং পরবর্তীতে ডিম ফুটে বের হওয়া ছোট পোনা বা জাটকাকে বড় হওয়ার পর্যাপ্ত সময় দেওয়াই এই দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার মূল দর্শন। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য অনুযায়ী, প্রাকৃতিক নিয়মে অমাবস্যা ও পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে মা ইলিশের ডিম ছাড়ার বিশেষ প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই বিশেষ সময়ে সাগরের নোনা জল থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ মিঠাপানির নদ-নদীতে উজানে উঠে আসে এবং তাদের পেটে সম্পূর্ণ পরিপক্ব ডিম থাকে। এই বৈজ্ঞানিক সত্যকে বিবেচনায় নিয়েই প্রতি বছর আশ্বিন মাসের প্রধান প্রজনন মৌসুমে একটানা বাইশ দিন সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
এর পাশাপাশি মা ইলিশের ছাড়া ডিম থেকে জন্ম নেওয়া পঁচিশ সেন্টিমিটারের চেয়ে কম দৈর্ঘ্যের পোনা বা জাটকা মাছকে উপকূলীয় মোহনা ও নদীতে অন্তত পাঁচ থেকে আট মাস নির্বিঘ্নে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিতে দীর্ঘমেয়াদি জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়ে থাকে। নভেম্বর মাস থেকে শুরু করে পরবর্তী বছরের জুন মাস পর্যন্ত আট মাসব্যাপী জাটকা নিধনে কঠোর নজরদারি চালানোর বিধান রাখা হয়েছে, যার মধ্যে বিশেষ দুই মাস কোনো ধরনের মাছ ধরার ওপর সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকে। বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য ছিল পোনা মাছগুলোকে পরিণত রূপালি ইলিশে পরিণত হওয়ার অবকাশ দেওয়া, যাতে পরবর্তী সময়ে বাজারে বড় আকারের সুস্বাদু ইলিশের প্রাচুর্য বজায় থাকে।
তবে এই কঠোর বৈজ্ঞানিক কাঠামোর বিপরীতে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। চাঁদপুরসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে মা ইলিশ রক্ষার বাইশ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলাকালে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায় যে অভিযানের চেয়ে অসাধু জেলেদের তৎপরতাই বেশি দৃশ্যমান। নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড, স্থানীয় জেলা প্রশাসন এবং মৎস্য অধিদপ্তরের সমন্বয়ে যৌথ টাস্কফোর্স নদীতে নিয়মিত টহল দিলেও সুবিশাল জলসীমার তুলনায় প্রশাসনের জনবল ও নৌযানের সামর্থ্য একেবারেই অপ্রতুল। দিনে বা রাতে একটু সুযোগ পেলেই অসাধু জেলেরা শত শত নৌকা নিয়ে নদীতে নেমে পড়ে এবং নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও সুতি জাল ফেলে লাখ লাখ ডিমওয়ালা মা ইলিশ অবাধে নিধন করে।
নদীতে সার্বক্ষণিক বা চব্বিশ ঘণ্টা অভিযান পরিচালনা করার জন্য মৎস্য দপ্তরের প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল, আধুনিক দ্রুতগতির বোট এবং বাজেট বরাদ্দের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। এই প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র নদীতে অবৈধভাবে মাছ শিকারের বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। এমনকি কোনো কোনো প্রত্যন্ত নদী মোহনায় অভিযান তদারকির দায়িত্বে থাকা কিছু অসৎ সদস্যের সঙ্গে গোপন আর্থিক আঁতাত গড়ে তুলে অবাধে ইলিশ নিধনের গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো কামরুল ইসলাম এই সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন যে সীমাহীন নদীসীমার বিপরীতে তাঁদের সামর্থ্য অত্যন্ত সীমিত এবং সাধারণ জেলে ও মৎস্যজীবীরা আন্তরিকভাবে সচেতন না হলে কেবল পুলিশ দিয়ে নদী পাহারা দেওয়া অসম্ভব।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের নদী কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড তায়েফা আহমেদ ইলিশের গতিবিধি ও প্রজনন পরিবর্তনের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তিনি জানান যে অতীতে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম ছিল সেপ্টেম্বর মাসে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবে ঋতুচক্র এবং নদীর পানির তাপমাত্রা ও প্রবাহে ব্যাপক ওলটপালট ঘটেছে। ফলে ইলিশের ডিম ছাড়ার উপযুক্ত সময় সেপ্টেম্বর থেকে পিছিয়ে অক্টোবর মাসে স্থানান্তরিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা কয়েক দশকের আবহাওয়া ও নদীবিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেই মা ইলিশ রক্ষার অভিযানের সময়কাল আশ্বিনের অমাবস্যা ও পূর্ণিমার সঙ্গে সমন্বয় করে অক্টোবর মাসে নির্ধারণ করেছেন।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং প্রখ্যাত ইলিশ বিশেষজ্ঞ ড আনিছুর রহমান ইলিশ রক্ষার তুলনা করেছেন কৃষিক্ষেত্রে বীজ বপনের সঙ্গে। তিনি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে কৃষক যদি জমিতে কোনো বীজ বপন না করে, তবে সে কখনোই কাঙ্ক্ষিত ফসলের দেখা পাবে না। ঠিক তেমনই মা ইলিশকে যদি নদীতে নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ না দেওয়া হয়, তবে নতুন পোনার জন্ম হবে না এবং ভবিষ্যতে নদী বা সাগরে ইলিশের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। ড আনিছুর রহমান জানান যে বছরে বারোটি অমাবস্যা ও বারোটি পূর্ণিমা থাকলেও গবেষণায় দেখা গেছে যে পূর্ণিমার তিথিতে ইলিশ সবচেয়ে বেশি ডিম ছাড়ে এবং অমাবস্যার সময়েও প্রচুর ডিম পাওয়া যায়। এই দুটি তিথির সংযোগ ঘটাতেই একটানা বাইশ দিনের নিষেধাজ্ঞা বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছিল।
তবে বিশেষজ্ঞরা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে সতর্ক করে বলেছেন যে ইলিশের উৎপাদন কমার পেছনে শুধু আইন অমান্য করে মাছ শিকারই একমাত্র কারণ নয়, বরং দেশের নদীগুলোর ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় এই সংকটের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। দেশের প্রায় প্রতিটি প্রধান নদী অববাহিকায় বর্তমানে শত শত অবৈধ ড্রেজার বসিয়ে অপরিকল্পিতভাবে অবাধে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এই নির্বিচার বালু তোলায় নদীর স্বাভাবিক তলদেশ সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে, নদীগর্ভের গভীরতা নষ্ট হচ্ছে এবং মাইলের পর মাইল জুড়ে জেগে উঠছে কৃত্রিম ও অস্বাভাবিক ডুবোচর। নদীর এই শারীরিক পরিবর্তনের কারণে সাগরের তলদেশ থেকে মূল ভূখণ্ডের মিঠাপানিতে ইলিশের অবাধ মাইগ্রেশন বা চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এর ওপর দেশের নদীগুলোতে যুক্ত হয়েছে মারাত্মক রাসায়নিক ও শিল্পবর্জ্যের দূষণ। কলকারখানার অপরিশোধিত বিষাক্ত বর্জ্য, পয়োবর্জ্য এবং নৌযানের পোড়া মবিল ও তেলের কারণে নদীর পানির দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। ইলিশ অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রকৃতির মাছ, যা সামান্যতম দূষণ বা নদীর তলদেশে পলি জমার কারণে দিক পরিবর্তন করে ফেলে। পরিবেশবিদরা বলছেন যে নদীর নাব্য হ্রাস এবং মোহনাগুলোতে জেগে ওঠা চরের কারণে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকতে না পেরে পথ পরিবর্তন করে প্রতিবেশী দেশগুলোর গভীর সমুদ্র ও উপকূলের দিকে চলে যাচ্ছে।
সার্বিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে কেবল বছরে একবার বা দুবার নদীতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং রুটিনমাফিক কিছু অভিযান চালিয়ে দেশের জাতীয় মাছের প্রাচুর্য ধরে রাখা সম্ভব হবে না। ইলিশের উৎপাদন পুনরায় বৃদ্ধি করতে হলে বিজ্ঞানসম্মত নিষেধাজ্ঞার কঠোর ও নির্মোহ প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নদীর বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করতে হবে। অবৈধ বালু উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ করা, প্রধান নদীগুলোর স্বাভাবিক নাব্য ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক ড্রেজিং নিশ্চিত করা এবং নদীর পানির দূষণ কঠোর হাতে রোধ করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় জাতীয় অগ্রাধিকার।
তথ্যসূত্র: বাংলাট্রিবিউন