ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি বাজারে বিমান হামলায় অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। শুক্রবার ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের এক কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ হামলায় আহত হয়েছেন আটজন। হুথি বিদ্রোহী ও সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরুর পর এটিই ইয়েমেনে সবচেয়ে বড় প্রাণঘাতী হামলা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে হতাহতের এ তথ্য জানান হুথি নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আনিস আলসাবাহি। তিনি জানান, তাইজ প্রদেশের আল-ওয়াজিয়াহ এলাকার ওই বাজারে হামলা চালানো হয়।
এপির খবরে বলা হয়, তাইজের বেশির ভাগ এলাকা হুথিদের নিয়ন্ত্রণে। তারা প্রদেশটির রাজধানী অবরুদ্ধ করে রেখেছে। ওই শহরেই সৌদি-সমর্থিত সরকার ও তাদের বাহিনীর অবস্থান।
হুথিদের পরিচালিত আল-মাসিরা টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিওতে হামলাস্থল থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে। সেখানে টিনজাত খাবার রাখা একটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, ধ্বংস হয়ে যাওয়া যানবাহন, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ফলের বাক্স এবং ধ্বংসস্তূপ দেখা যায়।
প্রাণঘাতী এ বিমান হামলার দায় নিয়ে ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সামরিক বাহিনী ও হুথি বিদ্রোহীরা একে অপরকে অভিযুক্ত করেছে। শহরটিতে সৌদি সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই এলাকায় কোনো বিমান হামলা চালানো হয়নি।
অন্যদিকে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে তাইজ প্রদেশের আল-ওয়াজিয়াহ এলাকার আল-হাদারা বাজারে তিনটি বিমান হামলা চালানো হয়।
তিনি এ হামলার জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করেন। তার দাবি, যুদ্ধবিমানগুলো সৌদি আরবের খামিস মুশাইত বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করেছিল এবং সকাল ৮টার দিকে তাইজ প্রদেশ ছেড়ে যায়। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে সৌদি আরবের তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
দিনের শুরুতে বাজারে কতজন মানুষ ছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে আরব বিশ্বের অনেক দেশে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় এদিন সাধারণত বাজারগুলোতে ভিড় থাকে।
প্রাদেশিক গণমাধ্যম কার্যালয় ফেসবুকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ব্যস্ত ওই বাজারে হামলার কথা স্বীকার করেছে। বিবৃতিতে হতাহতের কথাও বলা হয়েছে, তবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, হুথিদের নির্বিচার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, যার মধ্যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহারও রয়েছে, বেসামরিক মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বাজার ও জনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়।
গত মাসে হুথি বিদ্রোহীরা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। দক্ষিণাঞ্চলীয় শাবওয়া প্রদেশের একটি সামরিক শিবিরে ওই হামলায় অন্তত ৭৫ সেনা নিহত হন এবং প্রায় ২০০ নবীন সেনাসদস্য আহত হন। সে সময় শিবিরটিতে হামলা চালানোর কথা স্বীকার করেছিল বিদ্রোহীরা।
এর আগে সেপ্টেম্বরে দেশটির উত্তরাঞ্চলে একটি কারাগারে সৌদি আরব হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছিল হুথি বিদ্রোহীরা। জাওফ প্রদেশের রাজধানী হাজমে অবস্থিত কারাগারটি জোট বাহিনীর বিমান হামলায় ধসে পড়ে। এতে অন্তত ২৩ জন নিহত হন।
সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ ইয়েমেনে প্রবেশের কৌশলগত প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত তাইজের দিকে অগ্রযাত্রা জোরদার করে হুথিরা। এর আগে দ্রুতগতির অভিযানে লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখল করে তারা। তাইজ থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার বা ৮০ মাইল দূরে অবস্থিত মোখা।
তাইজ শহরটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও হুথিরা শহরটিকে ঘিরে তাদের অবরোধ আরও জোরদার করেছে। এতে বেসামরিক মানুষের আগে থেকেই ভয়াবহ মানবিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে। হুথিরা শহরে প্রবেশের পথ সীমিত করায় বাসিন্দারা খাবার ও পানীয় জলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
তাইজের চারপাশের পাহাড়ি এলাকায় সরকারি বাহিনী হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানোর চেষ্টা করছে। তবে বিশেষ করে শহরের পূর্ব দিকে তারা কঠোর প্রতিরোধের মুখে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণের এডেন ও লাহজের দিকে অগ্রসর হতে চাইলে তাইজ শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হুথিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শহরটি দখল করা তাদের জন্য সহজ হবে না।