বাংলাদেশে বর্তমানে মূলধারার গণমাধ্যম আগের চেয়ে স্বাধীন ও অনুসন্ধানী হলেও সাংবাদিকতা এক ধরনের ‘সর্বগ্রাসী আতঙ্কের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার ‘দ্য লিসেনিং পোস্ট’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের গণমাধ্যমের বর্তমান পরিস্থিতি, ভয়ের সংস্কৃতি এবং বিগত সরকারের দমনপীড়ন নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন।
স্বাধীনতা ও আতঙ্কের দ্বান্দ্বিক অবস্থান
মাহফুজ আনাম বলেন, “বর্তমানে আমাদের মূলধারার গণমাধ্যম অনেক বেশি স্বাধীন এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও বাড়ছে। কিন্তু একই সঙ্গে একটি সর্বগ্রাসী আতঙ্কও বিরাজ করছে। কোনো গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া মতের চেয়ে সামান্য ভিন্ন কিছু বললেই হামলার শিকার হওয়ার শঙ্কা কাজ করে।” তিনি আরও বলেন, এই ভীতির কারণে সাংবাদিকদের এখন শব্দ চয়নেও সতর্ক থাকতে হচ্ছে। তিনি বলেন, “ভাবি, এ শব্দটি ব্যবহার করব, নাকি ওই শব্দটি! এটি স্বাধীন গণমাধ্যম সংস্কৃতির পরিপন্থী হলেও এখন সেটাই করতে হচ্ছে।”
ডেইলি স্টার ভবনে হামলা ও ‘চরম আতঙ্কের’ রাত
সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টার ভবনে হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যারা হামলা চালিয়েছিল, তারা সম্ভবত পত্রিকার পাঠক নয়। এই হামলাকে ‘সুপরিকল্পিত’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর পেছনে রাজনৈতিক ও আর্থিক উদ্দেশ্য ছিল। হামলাকারীদের লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র ও ভিন্নমতকে সমর্থন করা উদার সাংবাদিকতার ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে দেওয়া। হামলার রাতের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে মাহফুজ আনাম বলেন, “ওটা ছিল চরম আতঙ্কের রাত। ভেতরে আটকে পড়া কর্মীরা নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না। তারা ফোনে বলছিল—‘মাহফুজ ভাই, হয়তো আমাদের আর দেখা হবে না।’ তারা তাদের পরিবারকে বিদায় জানাচ্ছিল।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘রাজনৈতিক ব্যবহার’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে মতপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে স্বীকার করলেও এর অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে হেয় করতে এবং রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ করতে এর ব্যবহার এখন প্রচলিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, “ডেইলি স্টারে হামলার রাতে একজন ইনফ্লুয়েন্সার বলেছিলেন—‘প্রথম আলো ডান, ডেইলি স্টারে চলে আসেন।’ আমাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তার কোনোটিই প্রমাণিত হয়নি। অনেক সময় আমাদের বক্তব্যকে প্রেক্ষাপটের বাইরে উপস্থাপন করা হয়েছে।”
সাংবাদিকদের রাজনৈতিক বিভাজন ও জনআস্থা
গণমাধ্যমের ওপর জনআস্থা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে সাংবাদিকদের রাজনৈতিক বিভাজনকে দায়ী করেন মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, “বছরের পর বছর ধরে সাংবাদিকরা রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত হয়েছেন। যখন মানুষ দেখে যে সত্য বলার দায়িত্বে থাকা সাংবাদিক কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত, তখন সেই গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
বিগত সরকারের দমননীতি ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলকে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের’ যুগ হিসেবে অভিহিত করেন ডেইলি স্টার সম্পাদক। তিনি বলেন, ওই আইনে শাস্তির ২০টি বিধানের ১৪টিই ছিল জামিন অযোগ্য, যা সমাজকে চুপ করিয়ে দেওয়ার জন্য করা হয়েছিল। নিজের ওপর হওয়া হয়রানির কথা তুলে ধরে তিনি জানান, শেখ হাসিনা তার বিরুদ্ধে ৮৩টি মামলা করেছিলেন। প্রথম আলো সম্পাদকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা এবং বিজ্ঞাপনের আয় বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে মাহফুজ আনাম বলেন, তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে না পারার পর জনগণ এখন চতুর্থটির দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যৎ সরকারগুলো অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে মুক্ত গণমাধ্যমের পথ প্রশস্ত করবে।