শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:০৫ অপরাহ্ন

‘টিস্যু পেপার’ গালি আর চরিত্র হনন: অপমান সয়েই ৮৫ নারীর ভোটের লড়াই

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা / ৬৮ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা ভোটার তালিকার অর্ধেক জুড়ে তারা, অথচ ভোটের মাঠে তাদের অস্তিত্ব মাত্র ৪ শতাংশ। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া এই স্বল্পসংখ্যক নারী প্রার্থীকে লড়তে হচ্ছে এক অসম ও নির্দয় যুদ্ধে। যেখানে প্রতিপক্ষ কেবল অন্য প্রার্থী নন, বরং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, কুরুচিপূর্ণ গালিগালাজ এবং চরিত্র হননের মতো জঘন্য সব অস্ত্র।

অস্তিত্বের সংকট ও একলা লড়াই আসন্ন নির্বাচনে মোট ২ হাজার ১৭ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী মাত্র ৮৫ জন। বিগত নির্বাচনের তুলনায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ার বদলে কমেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ২০ জন নারী প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভৌগোলিক অবস্থান ভিন্ন হলেও তাদের বেদনার চিত্র প্রায় একই। রংপুর থেকে রাঙামাটি, কিংবা বরিশাল থেকে ঢাকা—সর্বত্রই নারীদের দৈনন্দিন চলাফেরা থেকে প্রচারণায় পোহাতে হচ্ছে বাড়তি ঝুঁকি ও লাঞ্ছনা।

অপমানের নীল দংশন প্রার্থীদের অভিজ্ঞতাগুলো শিউরে ওঠার মতো। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা জানান, প্রকাশ্য জনসভায় তাকে লক্ষ্য করে ‘টিস্যু পেপার হয়ে গেছে, টিস্যু পেপার কাজে লাগে না’—এমন অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়েছে। আক্রমণ করা হয়েছে তার পোশাক নিয়েও। নাটোর-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ও সমর্থকদের দ্বারা জঘন্য বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অশালীন মন্তব্য তাকে ঠেলে দিয়েছে চরম মানসিক যন্ত্রণায়।

চরিত্র হননই যখন প্রধান অস্ত্র ঢাকা-৮ (চ) আসনের গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মেঘনা আলমের অভিযোগ আরও গুরুতর। তিনি বলেন, নারী হওয়া এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপোষহীন অবস্থান নেওয়ায় পরিকল্পিতভাবে তার চরিত্র হনন করা হচ্ছে। এমনকি তার নারী প্রচারকর্মীদের ধর্ষণের হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। বরিশালের প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী জানান, তার বিরুদ্ধে নিয়মিত সাইবার আক্রমণ তো চলছেই, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘মৌলবাদী’ তকমাধারী প্রতিপক্ষের অবমাননাকর আচরণ। এজেন্ট দিতে গেলেও শুনতে হচ্ছে হুমকি।

নিজ ঘরেই পরবাসী শেরপুর-১ আসনের বিএনপি প্রার্থী ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা আক্ষেপ করে বলেন, “একজন এমপি প্রার্থী হিসেবে নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছ থেকেই সম্মান পাচ্ছি না। আমি যদি সম্মান না পাই, তবে আমার আসনের ৫২ শতাংশ নারী ভোটার কীভাবে সম্মান পাবে?” ঢাকা-২০ আসনের নাবিলা তাসনিদ প্রশাসনিক বৈষম্যের অভিযোগ তুলে বলেন, তার ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা হলেও কোনো প্রতিকার মেলেনি।

ব্যতিক্রম কেবল পাহাড়ে নির্মম এই বাস্তবতার মধ্যেও কিছুটা স্বস্তির বাতাস বইছে পাহাড়ি জনপদে। রাঙামাটির প্রার্থী জুঁই চাকমা জানান, সেখানে প্রার্থীদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে এবং তিনি হয়রানির শিকার হননি। একই রকম ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ঝালকাঠি-২ ও রংপুর-৬ আসনের নারী প্রার্থীরাও।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক বলেন, পুরুষ প্রার্থীরা সহিংসতার শিকার হলেও নারীদের দমাতে ব্যবহার করা হচ্ছে ভয়ভীতি ও মানসিক পীড়ন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম মনে করেন, প্রচারণায় নারীর প্রতি অবমাননাকর বক্তব্য নির্বাচনী আচরণবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন। যদিও নির্বাচন কমিশন বলছে, অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভোটের লড়াই শেষ হবে, কেউ জিতবেন কেউ হারবেন। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির বাঁকা চোখের সামনে দাঁড়িয়ে ৮৫ জন নারীর এই যে আত্মসম্মানের লড়াই, তা কি সহজে শেষ হবে?—এই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।


এ জাতীয় আরো খবর...