শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:০৫ অপরাহ্ন

তরুণদের হাতে স্বৈরাচারের পতন, কিন্তু নির্বাচনে এগিয়ে পুরোনো শক্তি: বিবিসির প্রতিবেদন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক / ৭৩ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৫ বছরের শেখ হাসিনা শাসনের পতন ঘটিয়েছিল দেশের তরুণ সমাজ। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া সেই আন্দোলনের মুখে হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। এই বিপ্লব বিশ্বজুড়ে ‘জেন জি’ বা তরুণ প্রজন্মের সাফল্য হিসেবে প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু এক বছর না যেতেই প্রশ্ন উঠেছে—বিপ্লব কি সত্যিই তরুণদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে পারছে, নাকি পুরোনো শক্তির হাতেই ফিরছে দেশের রাজনীতি?।

ছাত্রনেতৃত্ব ও নতুন মেরুকরণ

আন্দোলনের সময় আশা করা হয়েছিল, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বিমেরুকরণ ভেঙে তরুণরাই নতুন পথ দেখাবে। কিন্তু আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের আগে সেই আশায় বড় ধাক্কা লেগেছে।

  • এনসিপির সংকট: ছাত্রনেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) অনভিজ্ঞতা ও আস্থার সংকটে ভুগছে। ভোটের মাঠে টিকে থাকতে তারা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বেঁধেছে, যা নিয়ে তরুণদের মধ্যেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

  • জামায়াতের উত্থান: ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামী দুর্নীতি দমন ও সুবিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তরুণ ভোটারদের নজর কেড়েছে। এনসিপিকে মাত্র ৩০টি আসন দিলেও জামায়াত নিজে ২০০টির বেশি আসনে প্রার্থী দিয়েছে।

তরুণদের মোহভঙ্গ ও জামায়াত-প্রীতি

২৪ বছর বয়সী রাহাত হোসেন, যিনি আন্দোলনে বন্ধু এমাম হাসান তাইম ভূঁইয়াকে হারিয়েছেন, তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি হতাশ। তার মতে, সরকার কাঙ্ক্ষিত শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে। তিনি এনসিপিকে অনভিজ্ঞ মনে করেন এবং তার দৃষ্টি এখন জামায়াতে ইসলামীর দিকে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তৌফিক হক মনে করেন, তরুণ ভোটাররা জামায়াতের একাত্তরের বিতর্কিত অতীতকে এখন আর ‘লাল দাগ’ হিসেবে দেখছেন না। বরং শেখ হাসিনার শাসনামলে জামায়াতও ভুক্তভোগী ছিল—এই ধারণা তরুণদের মধ্যে কাজ করছে।

নারীদের অবস্থান ও হতাশা

আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য, কিন্তু নির্বাচনের মাঠে তারা অনেকটাই কোণঠাসা।

  • প্রার্থী সংকট: এনসিপি-জামায়াত জোটের ৩০টি আসনের মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ২ জন। জামায়াতের নিজস্ব প্রার্থীদের সবাই পুরুষ।

  • বুলিং ও চরিত্র হনন: ২৫ বছর বয়সী আন্দোলনকারী শিমা আক্তার অভিযোগ করেন, সামাজিক মাধ্যমে তাদের চরিত্র হনন করা হচ্ছে এবং নারীদের একপাশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তিনি একে ‘পুরুষতান্ত্রিক অজুহাত’ বলে অভিহিত করেছেন। হতাশ শিমা আক্তার আপাতত বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন, যারা ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। তার মতে, এটি ‘মন্দের ভালো’।

বিএনপির পুনরুত্থান ও আওয়ামী লীগের হুঁশিয়ারি

আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও এনসিপির দুর্বলতার সুযোগে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে বিএনপি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি নিজেদের উদার গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে এবং ‘রেইনবো নেশন’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। অন্যদিকে, আত্মগোপনে থাকা এক আওয়ামী লীগ নেতা বিবিসিকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, শেখ হাসিনা নির্দেশ দিলে তারা নির্বাচন প্রতিরোধ করবেন। তার মতে, আওয়ামী লীগকে ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।

বিপ্লবের সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন

আগামী সপ্তাহের ভোটের ফলাফলই বলে দেবে, ছাত্রদের রক্তক্ষয়ী বিপ্লব আদৌ সার্থক ছিল কি না। বন্ধু হারানোর স্মৃতি বুকে নিয়ে রাহাত হোসেনের মতো তরুণরা এখনো একটি ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশের অপেক্ষায়। রাহাতের ভাষায়, “তেঁতুল গাছ থেকে আম আশা করা যায় না।” অর্থাৎ সংস্কার ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণ।


এ জাতীয় আরো খবর...