বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় এক নতুন ও কৌতূহলোদ্দীপক সমীকরণ দৃশ্যমান হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এখন ভোটের মাঠে পরস্পরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর বিতর্কিত ভূমিকা। নির্বাচনী জনসভাগুলোতে বিএনপি নেতারা এখন জামায়াতকে লক্ষ্য করে তীক্ষ্ণ আক্রমণ শানাচ্ছেন, যার প্রধান অস্ত্র হচ্ছে ‘মুক্তিযুদ্ধ’।
বিএনপির এই হঠাৎ ভোলবদল এবং জামায়াত-বিরোধিতা রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একসময় যাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন করেছে, জোট বেঁধে সরকার গঠন করেছে, সেই জামায়াতের বিরুদ্ধেই এখন কেন সরব বিএনপি? বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এর পেছনে কাজ করছে সুগভীর রাজনৈতিক কৌশল, ভোটের জটিল অঙ্ক এবং পরিবর্তিত বাস্তবতার নিরিখে নতুন মেরুকরণের চেষ্টা।
২০০৮ সালের পর থেকে দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে বিএনপি এবং জামায়াত—উভয় দলই ছিল কোণঠাসা। হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়ে দুই দলই অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। সরকারবিরোধী নানা আন্দোলনে তাদের যুগপৎ কর্মসূচি পালন করতে দেখা গেছে। কিন্তু ৫ আগস্টের পটপরিবর্তন এবং আসন্ন নির্বাচন এই সমীকরণে নাটকীয় মোড় এনেছে।
এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি ভোটের মাঠকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে বিএনপির সামনে এখন আর কোনো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ নেই—একমাত্র জামায়াতে ইসলামী ছাড়া। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে যোগ দেওয়ায় এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলে, এতদিন যারা ছিল মিত্র, ভোটের মাঠে তারাই এখন একে অপরের প্রধান প্রতিপক্ষ। আর এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে থাকার কৌশল হিসেবেই বিএনপি বেছে নিয়েছে জামায়াতের ‘আকিলিস হিল’ বা দুর্বলতম স্থান—একাত্তরের ভূমিকা।
নির্বাচনী প্রচারণা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার পর থেকেই বিএনপি তাদের বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ জোরালোভাবে সামনে আনছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করছেন দলটির শীর্ষ নেতারা।
তারেক রহমানের কড়া বার্তা:
গত ২২শে জানুয়ারি সিলেটে এক নির্বাচনী জনসভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জামায়াতকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আরে ভাই, আপনাদেরকে তো মানুষ একাত্তরে দেখেছে; ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। একাত্তরে মানুষ দেখেছে আপনারা কীভাবে দেশের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।” তিনি আরও বলেন, মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার সময় অনেকের বিতর্কিত ভূমিকা জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। তারেক রহমানের এই বক্তব্য বিএনপির বর্তমান অবস্থানের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
মির্জা ফখরুলের প্রশ্নবাণ:
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও একই সুরে কথা বলছেন। ২৮শে জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে এক সমাবেশে তিনি ভোটারদের উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন রাখেন, “যারা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, তাদের হাতে কি দেশ চালানোর দায়িত্ব দেওয়া যায়?” তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন, জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল এবং তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিল না।
বিএনপি নেতাদের এসব বক্তব্য প্রমাণ করে যে, তারা এবার জামায়াতকে ‘অ্যাটি-লিবারেশন ফোর্স’ বা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে ভোটারদের কাছে নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একমাত্র শক্তিশালী দল হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে।
বিএনপির এই হঠাৎ জামায়াত-বিরোধিতা কি শুধুই আদর্শিক অবস্থান, নাকি এর পেছনে রয়েছে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার কৌশল? বিশ্লেষকদের মতে, এখানে উভয় কারণই সক্রিয়, তবে নির্বাচনী সমীকরণই মুখ্য।
আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক লক্ষ্য:
আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় তাদের বিশাল ভোট ব্যাংক এখন অনেকটাই দিকভ্রান্ত। বিএনপি জানে, আওয়ামী লীগের সমর্থকরা কখনোই জামায়াতকে ভোট দেবে না। কিন্তু তারা বিএনপিকেও সহজে গ্রহণ করতে চাইবে না। এই পরিস্থিতিতে জামায়াতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে বিএনপি মূলত আওয়ামী লীগের সেই ‘সেক্যুলার’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধপন্থী’ ভোট নিজেদের বাক্সে টানার চেষ্টা করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, “আওয়ামী লীগ যেহেতু নাই এবং প্রতিপক্ষ জামায়াত, তাই বিএনপির হাতে এখন দু’টো অস্ত্র—মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্ম। মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের বিতর্কিত ভূমিকা থাকায় আওয়ামী লীগের ভোটার টানতে বিএনপি এটা করছে।”
জামায়াতের উত্থান ও বিএনপির শঙ্কা:
৫ আগস্টের পর দেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের বেশ গুছিয়ে নিয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রশিবিরের সাম্প্রতিক সাফল্য এবং তৃণমূলে তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা বিএনপিকে ভাবিয়ে তুলেছে। বিএনপি বুঝতে পারছে, জামায়াতকে এখনই থামানো না গেলে ভবিষ্যতে তারা বিএনপির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই নির্বাচনের আগেই জামায়াতকে কোণঠাসা করতে তাদের পুরোনো ইতিহাসকে সামনে আনা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা:
বিএনপি আন্তর্জাতিক মহলকে, বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বকে দেখাতে চায় যে তারা একটি মধ্যপন্থী ও উদার গণতান্ত্রিক দল। জামায়াতের মতো ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বজায় রাখা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়া—আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের ক্ষেত্রে বিএনপির জন্য সহায়ক হতে পারে।
বিএনপি এখন জামায়াতের সমালোচনা করলেও ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন শুরু হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে সরকার গঠনে জামায়াতের সমর্থন নেওয়া এবং ২০০১ সালে চারদলীয় জোট গঠন করে একসঙ্গে নির্বাচন ও সরকার পরিচালনা—সবকিছুই বিএনপির ইতিহাসের অংশ।
এমনকি ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছিলেন যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াত নেতারা। মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মতো নেতারা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এই প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বিবিসি বাংলাকে বলেন, “সেসময় জামায়াত বাংলাদেশে লিগ্যাল পার্টি ছিল। জামায়াতকে নিয়ে আওয়ামী লীগও আন্দোলন করেছে। আর আমরা একটা স্ট্র্যাটেজিক ইলেকশন পার্টনার (কৌশলগত নির্বাচনী অংশীদার) তৈরি করেছিলাম। এর অর্থ এই না যে তাদের কলঙ্ক মুছে গেছে।” তিনি আরও দাবি করেন, জোট করার অর্থ এই নয় যে বিএনপি জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকার দায় নিয়েছে।
বিএনপির এই সমালোচনার জবাবে জামায়াতে ইসলামীও বসে নেই। তারা বিএনপির এই কৌশলকে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব ও ‘ভোঁতা হাতিয়ার’ ব্যবহারের চেষ্টা বলে অভিহিত করেছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “জামায়াতে ইসলামীকে আদর্শিক ও রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি এখন এই ভোঁতা হাতিয়ার ব্যবহার করছে, যা জাতি আর গ্রহণ করতে চায় না।”
জামায়াতের দাবি, মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি একটি ‘মীমাংসিত অধ্যায়’। শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমান তাদের জীবদ্দশায় জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে বিষয়টির একরখা সমাধান করে গিয়েছিলেন বলে জামায়াত মনে করে। গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, “প্রত্যেকের সঙ্গে জামায়াত যখন থাকে, তখন সঙ্গী হয়, আর যখন থাকে না, তখন জঙ্গী হয়। এটাই হলো তাদের ন্যারেটিভ। এটা খারাপ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য।”
তিনি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ১৯৯১ সালে বিএনপি কেন সরকার গঠনে গোলাম আযমের সাহায্য চেয়েছিল? তখন তাদের নীতি কোথায় ছিল?
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশে ইতিহাসকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা একটি সাধারণ প্রবণতা। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, “গণহত্যার মতো বিষয় যদি কেউ অস্বীকার করে আর বলে মীমাংসা হয়ে গেছে, তবে সেখানে বিচার ও সত্যের প্রশ্ন আসবেই। আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে তো এমন বিতর্ক নেই। এটাই প্রমাণ করে যে এটি অমীমাংসিত ইস্যু।”
গবেষক আফসান চৌধুরীর মতে, “আমাদের দেশে ইতিহাসকে রাজনীতি বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এটি শুধু নির্বাচনের বিষয় না, সব কালেই হয়েছে। নির্বাচনের পরেও এটি চলবে।”
অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ মনে করেন, “নির্বাচনকালীন সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সম্পর্ক হয় ‘শত্রু-শত্রু’। তাই প্রচারণায় একে অপরের দুর্বলতা ব্যবহার করবেই। তবে দিনশেষে জোটে ফাটল ধরার সম্ভাবনা কম, কারণ জামায়াতের শক্ত অবস্থানের পেছনে বিএনপিরও ভূমিকা রয়েছে।”
নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার বাগযুদ্ধ তত তীব্র হচ্ছে। একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা এখন একে অপরের প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিএনপি চাইছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে এবং জামায়াত-ভীতি ছড়িয়ে মধ্যপন্থী ও আওয়ামী লীগ-ঘেঁষা ভোটারদের কাছে টানতে। অন্যদিকে, জামায়াত চেষ্টা করছে নিজেদের সুসংগঠিত এবং আধুনিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রমাণ করতে।
আগামী দিনের রাজনীতিতে এই দ্বন্দ্ব কতদূর গড়াবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচনের ফলাফলের ওপর। তবে এটা নিশ্চিত যে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং জামায়াতের ভূমিকা—বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা নির্বাচনের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কার কৌশলে সাড়া দেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা।