শিরোনামঃ
প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাবেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জনগণের অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠাই ছিল একুশের মূল চেতনা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একুশে ফেব্রুয়ারিতে কোনো নিরাপত্তা শঙ্কা নেই: ডিএমপি কমিশনার আজিমপুরে পিকআপের ধাক্কায় প্রাণ গেল অটোরিকশা চালকের রমজানেও স্বস্তি নেই বাজারে: মাছ-মাংসের আকাশছোঁয়া দাম, বেগুনের ‘সেঞ্চুরি’ জুলাই সনদ ও গণভোটের রায়: নির্বাচনের পর নতুন রাজনৈতিক সংকটে বাংলাদেশ যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান শহীদ দিবস পালনের আহ্বান জামায়াতের আমিরের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কয়েদির মৃত্যু: হাসপাতালে আনার আগেই শেষ নিঃশ্বাস বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ: পশ্চিমা নেতাদের বেইজিং সফর কি ওয়াশিংটনের জন্য সতর্কবার্তা? নলতায় প্রতিদিন ৬ হাজার মানুষের ইফতার: ভোরে শুরু হয় বিশাল কর্মযজ্ঞ
শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন

‘বোর্ড অব পিস’-এর আড়ালে গাজায় ৩৫০ একরের মার্কিন ঘাঁটি: নথি ফাঁসে তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৬ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

গাজায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠনের লক্ষ্যে গঠিত ‘শান্তি পর্ষদ’ বা ‘বোর্ড অব পিস’-এর আড়ালে বিশাল এক সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের গোপন পরিকল্পনা ফাঁস হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের হাতে আসা অত্যন্ত গোপনীয় কিছু নথির বরাতে বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশিত হয়। ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা গেছে, দক্ষিণ গাজার প্রায় ৩৫০ একর এলাকাজুড়ে ট্রাম্প প্রশাসন একটি বিশাল সামরিক দুর্গ গড়ে তোলার ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করেছে।

‘আইএসএফ’-এর সদর দপ্তর ও ৫ হাজার সেনার আবাস

নথির তথ্য অনুযায়ী, এই ঘাঁটিটি প্রস্তাবিত ‘আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী’ বা আইএসএফ (ISF)-এর প্রধান অপারেশনাল সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

  • সক্ষমতা: ৩৫০ একর জায়গাজুড়ে নির্মিতব্য এই ঘাঁটিতে প্রায় ৫ হাজার সেনাসদস্যের থাকার সুব্যবস্থা থাকবে।

  • নিয়ন্ত্রণ: পুরো প্রকল্পটি সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’-এর অধীনে পরিচালিত হবে।

  • নিরাপত্তা বেষ্টনী: ঘাঁটির দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ১,৪০০ মিটার এবং প্রস্থ ১,১০০ মিটার। নিরাপত্তার জন্য পুরো এলাকা কাঁটাতারের বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা থাকবে এবং নজরদারির জন্য ২৬টি সাঁজোয়া টাওয়ার বসানো হবে।

ঘাঁটির অভ্যন্তরীণ নকশা ও বিশেষ সতর্কতা

ফাঁস হওয়া নকশায় দেখা গেছে, ঘাঁটির ভেতরে ছোট অস্ত্রের প্রশিক্ষণ রেঞ্জ, সামরিক সরঞ্জামের বিশাল গুদাম এবং বিশেষ বাঙ্কার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

  • উন্নত বাঙ্কার: বাঙ্কারগুলো লম্বায় ৬ মিটার ও চওড়ায় ৪ মিটার হবে, যেখানে উন্নত বায়ু চলাচল (Ventilation) ব্যবস্থা থাকবে যাতে যুদ্ধের সময় সেনারা সুরক্ষিত আশ্রয় নিতে পারে।

  • সুড়ঙ্গ শনাক্তকরণ: নির্মাণকারী ঠিকাদারদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন তারা মাটির নিচে হামাসের কোনো গোপন সুড়ঙ্গ বা ফাঁপা জায়গা আছে কি না, তা শনাক্ত করতে জিওফিজিক্যাল সার্ভে পরিচালনা করে।

  • মরদেহ ব্যবস্থাপনা: গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা মরদেহ উদ্ধারের ক্ষেত্রে বিশেষ ‘হিউম্যান রিমেইনস প্রটোকল’ অনুসরণের কথাও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

১০ বিলিয়ন ডলারের অনুদান ও আন্তর্জাতিক মেরুকরণ

ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত শান্তি পর্ষদের প্রথম বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গাজা পুনর্গঠনের জন্য ১০ বিলিয়ন ডলার অনুদান ঘোষণা করেছেন। বৈঠকে আরও যা ঘটেছে:

  • কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

  • ইন্দোনেশিয়া প্রস্তাবিত নিরাপত্তা বাহিনীতে ৮ হাজার সেনা পাঠানোর অঙ্গীকার করেছে।

  • তবে ফিলিস্তিনিদের কোনো প্রতিনিধি ছাড়াই অনুষ্ঠিত এই বৈঠক বয়কট করেছে যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ইতালিসহ ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলো।

‘দখলদারিত্বের’ নতুন রূপ?

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা এই ঘাঁটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আইনজীবী ডায়ানা বুট্টু এই পরিকল্পনাকে সরাসরি ‘দখলদারিত্ব’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সরাসরি কোনো মার্কিন সেনা (US Boots on the ground) গাজায় মোতায়েন করা হবে না, তবে ফাঁস হওয়া নথির বিষয়ে তারা বিস্তারিত মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছে।

২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা’র বিস্তারিত

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সভাপতিত্বে গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদ গাজায় স্থিতিশীলতা ফেরাতে যে ‘২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা’ গ্রহণ করেছে, তার প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

🕊️ ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার মূল স্তম্ভসমূহ:

১. আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (ISF): গাজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৫ বছর মেয়াদি একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠন করা হবে, যার নেতৃত্বে থাকবে বোর্ড অব পিস।

২. মার্কিন ঘাঁটি নির্মাণ: দক্ষিণ গাজায় ৩৫০ একর জমিতে আইএসএফ-এর প্রধান অপারেশনাল সেন্টার ও কমান্ড সেন্টার স্থাপন করা হবে।

৩. হামাসের বিলুপ্তি: গাজায় হামাসের সব ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা এবং তাদের সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ ধ্বংস করা।

৪. ১০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল: গাজা পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্র ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক তহবিল ঘোষণা করেছে।

৫. আরব দেশগুলোর অর্থায়ন: কাতার, সৌদি আরব ও আমিরাত পুনর্গঠন কাজে বড় অংকের অর্থ সহায়তা দেবে।

৬. ৫ হাজার সেনার আবাসন: প্রস্তাবিত সামরিক ঘাঁটিতে ৫ হাজার বিদেশি সেনার জন্য আধুনিক আবাসন ও বাঙ্কার নির্মাণ করা।

৭. ইন্দোনেশিয়ার সৈন্য মোতায়েন: স্থিতিশীলতা রক্ষায় ইন্দোনেশিয়া ৮ হাজার সেনাসদস্য পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

৮. নিরাপত্তা নজরদারি: গাজার কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে ২৬টি আধুনিক নজরদারি টাওয়ার বসানো হবে।

৯. অস্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র: গাজার ভেতর নির্দিষ্ট এলাকায় আইএসএফ সদস্যদের জন্য অস্ত্র প্রশিক্ষণ রেঞ্জ তৈরি করা।

১০. সুড়ঙ্গ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি: নির্মাণকাজের আগে বিশেষ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপের মাধ্যমে মাটির নিচের গোপন সুড়ঙ্গ শনাক্ত করা।

১১. মরদেহ ব্যবস্থাপনা: ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মরদেহ উদ্ধারে বিশেষ আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুসরণ করা।

১২. বাঙ্কার ও স্টোরেজ: সামরিক সরঞ্জাম সংরক্ষণের জন্য উন্নত বায়ু চলাচল সুবিধাযুক্ত বাঙ্কার ও গুদাম নির্মাণ।

১৩. ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ সমন্বয়: বর্তমানে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলোতে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের আইনি ও কৌশলগত সমন্বয় করা।

১৪. ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিত্বহীন শাসন: গাজার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো বোর্ড অব পিস গ্রহণ করবে, যেখানে বর্তমানে ফিলিস্তিনিদের সরাসরি অংশগ্রহণ নেই।

১৫. ইউরোপীয় দেশগুলোর ভূমিকা: ইউরোপের দেশগুলোকে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার প্রচেষ্টা (যদিও বর্তমানে তারা পর্যবেক্ষক অবস্থায় আছে)।

১৬. বেসামরিকীকরণ: গাজা থেকে সব ধরনের ভারী অস্ত্রশস্ত্র অপসারণ এবং এলাকাটিকে সম্পূর্ণ বেসামরিকীকরণ করা।

১৭. সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ: গাজার সীমান্ত এলাকাগুলোতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী ও আধুনিক রাডার স্থাপন।

১৮. বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ: পুনর্গঠন কাজে আন্তর্জাতিক নামি-দামি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করা।

১৯. তাত্ক্ষণিক ত্রাণ কার্যক্রম: ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের জন্য জরুরি খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়া।

২০. মার্কিন বাহিনীর সরাসরি অংশগ্রহণ না থাকা: ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছে যে গাজায় সরাসরি কোনো মার্কিন স্থল সেনা মোতায়েন করা হবে না।


বোর্ড অব পিসের এই পরিকল্পনা গাজায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে নাকি ‘দখলদারিত্বের’ নতুন রূপ নেবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর বিতর্ক চলছে।


এ জাতীয় আরো খবর...