মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন আর কেবল সীমান্ত সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা এক ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। সোমবার (২ মার্চ) সকাল থেকে ইসরায়েল অভিমুখে ইরানের ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, কুয়েতে মার্কিন অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়া এবং কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে ধারাবাহিক বিস্ফোরণে পুরো বিশ্ব থমকে দাঁড়িয়েছে।
সোমবার সকালে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) নিশ্চিত করেছে যে, ইরান থেকে ছোঁড়া অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র দেশটির দিকে ধেয়ে আসছে। তেল আবিবসহ প্রধান শহরগুলোতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (আয়রন ডোম ও অ্যারো) সক্রিয় করা হয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আকাশজুড়ে প্রতিহত করা ক্ষেপণাস্ত্রের বিকট শব্দ শোনা যাচ্ছে। সাধারণ বাসিন্দাদের অবিলম্বে বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সুরক্ষিত স্থানে থাকার জন্য কঠোর সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
সংঘাতের মধ্যেই কুয়েতের আকাশে বড় ধরনের বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে মার্কিন বিমান বাহিনী। একটি অত্যাধুনিক এফ-১৫ (F-15) যুদ্ধবিমান মাঝআকাশে আগুন ধরে বিধ্বস্ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বিমানটি জ্বলন্ত অবস্থায় নিচে আছড়ে পড়ছে। টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, অন্তত একজন পাইলট প্যারাশুট দিয়ে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন।

এদিকে, রয়টার্স জানিয়েছে কুয়েতে মার্কিন দূতাবাসের কাছ থেকেও ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা গেছে। মিনা আল আহমাদি শোধনাগারের কাছে অজানা ধ্বংসাবশেষ পড়ে দুই শ্রমিক আহত হয়েছেন। পুরো কুয়েত সিটি এখন বিমান হামলার সাইরেনে প্রকম্পিত।
কাতারের রাজধানী দোহাতেও সোমবার সকালে অন্তত ছয়টি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর থেকে এটি কাতারে টানা তৃতীয় দিনের বিস্ফোরণ। আল জাজিরা বিশ্লেষণ করেছে যে, উপসাগরীয় দেশগুলোর সতর্কতা সত্ত্বেও ইরান মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলার তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কাতার ছাড়াও বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতেও সোমবার সকাল থেকে রেড অ্যালার্ট জারি রয়েছে।
ইরানের এই অব্যাহত হামলার মুখে জরুরি বৈঠকে বসেছে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি)। জোটের সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে (সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন ও আরব আমিরাত) বেসামরিক স্থাপনা ও আবাসিক এলাকায় হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে তারা। এক বিবৃতিতে জিসিসি বলেছে, ইরান আন্তর্জাতিক আইন ও সদস্য দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব চরমভাবে লঙ্ঘন করেছে। তারা ইরানকে অবিলম্বে হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, নিজেদের রক্ষায় জোটের পক্ষ থেকে যেকোনো প্রয়োজনীয় সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিগত কয়েক দশকের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে এটিই সবচেয়ে বড় সামরিক অস্থিরতা। গত রাতে কিছুটা বিরতি থাকলেও আজ সকাল থেকে ইরান যেভাবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার বাড়িয়েছে, তাতে মনে করা হচ্ছে তেহরান একটি ‘সর্বাত্মক যুদ্ধের’ (Total War) দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই হামলার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।