১৯৭১ সালের ৪ মার্চ। বসন্তের প্রকৃতি ছাপিয়ে তখন পুরো বাংলায় বইছে স্বাধীনতার তপ্ত হাওয়া। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে চলা অসহযোগ আন্দোলনের আজ চতুর্থ দিন। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে এসেছে আবালবৃদ্ধবনিতা। ঢাকার রাজপথ থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি প্রান্ত তখন এক ও অভিন্ন কণ্ঠে গর্জে উঠছে— ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’
অগ্নিঝরা এই দিনে ঢাকা ছিল হরতালের নগরী। সকাল থেকেই ঢাকার প্রতিটি অলিগলি থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল এসে জড়ো হতে থাকে রেসকোর্স ময়দান ও ধানমন্ডির ৩২ নম্বর অভিমুখে। পাকিস্তান রেডিও ও টেলিভিশনের বাঙালি কর্মীরা তখন সামরিক সেন্সরশিপ উপেক্ষা করে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। ঢাকাসহ সারা দেশে সামরিক জান্তার সান্ধ্য আইন (কারফিউ) ভাঙার লড়াইয়ে লিপ্ত হয় মুক্তিকামী মানুষ।
৪ মার্চের অন্যতম শোকাবহ ও বীরত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে খুলনায়। সেখানে হরতাল চলাকালে শান্তিকামী মিছিলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা অতর্কিতে গুলিবর্ষণ করে। এতে বেশ কয়েকজন বাঙালি শাহাদাতবরণ করেন এবং শত শত মানুষ আহত হন। খুলনার এই রক্তপাত বাঙালির স্বাধীনতার স্পৃহাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। শোক পরিণত হয় শক্তিতে।
ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন ব্যস্ত সময় পার করছেন ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে। ৪ মার্চ তিনি এক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “বাংলার মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ। কোনো বুলেটের ভয় বা অস্ত্রের আস্ফালন এই গণজাগরণকে দমাতে পারবে না।” তিনি সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারীদের প্রতি নির্দেশ দেন যাতে তারা পাকিস্তানি প্রশাসনের সঙ্গে সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করে দেন। প্রকৃতপক্ষে, এদিন থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের শাসনভার বঙ্গবন্ধুর হাতে চলে আসে।
ছাত্র-জনতার চাপে এবং বাঙালি কর্মকর্তাদের সাহসিকতায় ৪ মার্চ ‘রেডিও পাকিস্তান ঢাকা’র নাম পরিবর্তন করে শুধু ‘ঢাকা বেতার কেন্দ্র’ হিসেবে সম্প্রচার শুরু হয়। বেতার থেকে দেশাত্মবোধক গান এবং অসহযোগ আন্দোলনের খবর প্রচার হতে থাকে, যা মুক্তিকামী মানুষের মনোবল কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।