সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা হলো সুস্থ বিতর্ক, পরমতসহিষ্ণুতা এবং জনকল্যাণমুখী আইন প্রণয়ন। কিন্তু বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির গত পঁয়ত্রিশ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি ধূসর চিত্র ফুটে ওঠে। ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের পর থেকে আমরা কেবল ‘ওয়াকআউট’ আর ‘বর্জনের’ এক ক্লান্তিকর সংস্কৃতি দেখে আসছি। প্রশ্ন উঠেছে, জনগণের করের টাকায় পরিচালিত এই সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী প্রতিষ্ঠানটি কি কেবল রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের একটি ব্যয়বহুল মঞ্চে পরিণত হয়েছে?
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএমআই (CMI)-এর সাম্প্রতিক তথ্যমতে, বাংলাদেশের সংসদের প্রতি মিনিটের কার্যক্রমে খরচ হয় দুই লাখ টাকারও বেশি। অথচ এই বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে প্রকৃত অর্জন কতটুকু? পরিসংখ্যানে দেখা যায়:
আইন প্রণয়ন: আমাদের সংসদ আইন প্রণয়নে ব্যয় করে মাত্র ১২% সময়।
তুলনামূলক চিত্র: ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রে এই হারের পরিমাণ যথাক্রমে ৩২% ও ৪৮%।
আমাদের সংসদের সিংহভাগ সময় ব্যয় হয় চাটুকারিতা বা প্রতিপক্ষের বিষোদগারে। আইন প্রণেতাদের যে মেধা ও সময় জনস্বার্থে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল, তা হারিয়ে যাচ্ছে ওয়াকআউটের অন্তহীন মহড়ায়।
গত কয়েক দশকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংসদ বর্জন যেন রাজনীতির এক অলিখিত ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে:
| সংসদ (সময়কাল) | প্রধান বিরোধী দল | বর্জন/অনুপস্থিতির চিত্র | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| ৫ম ও ৭ম সংসদ | আওয়ামী লীগ / বিএনপি | ১০০+ দিন | তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে দীর্ঘ বর্জন। |
| ৮ম সংসদ (২০০১-০৬) | আওয়ামী লীগ | ২২৩ দিন | সংসদীয় ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘ বর্জন। |
| ৯ম সংসদ (২০০৮-১৪) | বিএনপি | ৩৪২ দিন | সর্বোচ্চ রেকর্ড: মোট কার্যদিবসের বিশাল অংশ অনুপস্থিত। |
| ১০ম সংসদ (২০১৪-১৮) | জাতীয় পার্টি | বর্জন ছিল না | বিএনপি নির্বাচনে না আসায় ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দলের তকমা। |
| ১১শ সংসদ (২০১৮-২৪) | জাতীয় পার্টি / বিএনপি | একযোগে পদত্যাগ | ২০২২ সালে বিএনপির ৭ জন সংসদ সদস্যের একযোগে পদত্যাগ। |
| ১২শ সংসদ (২০২৪) | জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র | বর্জনহীন কিন্তু অকার্যকর | স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আধিক্যে কার্যকর বিতর্কের সংকট। |
এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সংসদীয় আলোচনার চেয়ে ‘বর্জন’ করাকেই বেশি কার্যকর কৌশল হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে সংসদীয় গণতন্ত্র কেবল ‘একতরফা শাসনে’ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল একটি জবাবদিহিমূলক এবং প্রাণবন্ত সংসদ। কিন্তু ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতির ভাষণ বয়কট করার ঘটনা আমাদের সেই পুরোনো তেতো অভিজ্ঞতারই মনে করিয়ে দিচ্ছে। জুলাই বিপ্লবের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন বাংলাদেশেও যদি সেই পুরোনো ‘বিদ্বেষের রাজনীতি’ বহাল থাকে, তবে রাজনীতির খোলনলচে বদলানোর স্বপ্ন কেবল কাগজেই থেকে যাবে।
সংসদ কোনো দলের ব্যক্তিগত প্রাঙ্গণ নয়; এটি রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভের অন্যতম। সংসদ অকার্যকর হলে তার নেতিবাচক প্রভাব নির্বাহী ও বিচার বিভাগের ওপরও পড়ে। আজ সময় এসেছে এই সংস্কৃতি পরিবর্তনের। জনগণের ট্যাক্সের প্রতিটি পয়সার হিসাব দেওয়ার নৈতিক বাধ্যবাধকতা জনপ্রতিনিধিদের রয়েছে।
অহেতুক ওয়াকআউট বা বয়কট কোনো দলের দীর্ঘমেয়াদী জনপ্রিয়তা নিশ্চিত করতে পারে না। পঁয়ত্রিশ বছরের এই অচলায়তন ভেঙে সংসদ কি পারবে একটি সত্যিকার জবাবদিহিমূলক শাসন উপহার দিতে? নাকি ‘ব্যর্থ সংসদ’-এর তকমাটিই আমাদের চিরস্থায়ী ললাট লিখন হয়ে থাকবে? উত্তরটি এখন সংসদ সদস্যদের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।