পর্দা বদলেছে, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে নতুন মুখ, কিন্তু পাল্টায়নি মাঠপর্যায়ের সেই পুরনো চিত্র—‘চাঁদাবাজি’। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে দেশের ব্যবসায়িক মহলের যে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা ছিল, তাতে এখন বড় ধরনের ফাটল দেখা দিচ্ছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) সম্প্রতি যে আর্তনাদ ও হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তা কেবল একটি সংগঠনের ক্ষোভ নয়, বরং দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির এক রূঢ় বাস্তবতা।
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি। বরং সিন্ডিকেটগুলো এখন নতুন ছদ্মবেশে আরও বেপরোয়া। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রতিটি স্তরে এখন ‘চাঁদার রেট’ বেড়ে গেছে। কাঁচামাল পরিবহন থেকে শুরু করে কারখানার গেট পর্যন্ত প্রতিটি কদমেই দিতে হচ্ছে হিসেব বহির্ভূত টাকা।
“এটা লজ্জারও কিছু নয়, ভয়েরও কিছু নয় ভাই। এরপরে যদি হয় আমরা ব্যবসা বন্ধ করে চলে যাবো।” — তাসকিন আহমেদ, সভাপতি, ডিসিসিআই।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং ডিসিসিআই-এর তথ্যমতে, এই অদৃশ্য টাকার প্রবাহ দেশের সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে।
ডিসিসিআই-এর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে তিনটি প্রধান সংকট যা ব্যবসাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে:
সুদের হারের লাগামহীন ঘোড়া: ব্যাংক সুদের হার না কমলে নতুন বিনিয়োগ আসা এখন দিবাস্বপ্ন। উচ্চ সুদ মানেই উচ্চ বিনিয়োগ ঝুঁকি।
আর্থিক খাতের বৈষম্য: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য ও নীতিগত সুবিধাগুলো এখনো কেবল গুটিকয়েক ‘বড় খেলোয়াড়দের’ জন্য বরাদ্দ। মাঝারি ও ছোট উদ্যোক্তারা (SME) আজও অবহেলিত।
বাণিজ্য চুক্তির অনিশ্চয়তা: যুক্তরাষ্ট্রের সাথে করা ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ চুক্তিটি এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট এই ট্যারিফ অবৈধ ঘোষণার পর বাংলাদেশ যদি এখনই চুক্তিটি ‘রিনিগোশিয়েশন’ বা পুনর্বিবেচনা না করে, তবে সাড়ে ষোলো শতাংশ শুল্কের বোঝা দেশীয় রপ্তানিকারকদের ধসিয়ে দেবে।
ঢাকা চেম্বার একটি সমন্বিত ‘রোড টু রিভাইভাল’ কর্মসূচির প্রস্তাব করেছে। তাদের দাবি, সরকার যদি অবিলম্বে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ চালু না করে এবং ব্যাংক খাতে বৈষম্য দূর না করে, তবে অনেক কলকারখানায় তালা ঝুলে যাবে।
ব্যবসা বন্ধ হওয়া মানে কেবল মালিকের ক্ষতি নয়, বরং হাজার হাজার শ্রমিকের বেকারত্ব এবং জাতীয় অর্থনীতির পতন। ডিসিসিআই-এর এই হুঁশিয়ারি কি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কানে পৌঁছাবে? নাকি পুরোনো দুর্নীতির মেঘে ঢাকা পড়ে যাবে নতুন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা?
চাঁদাবাজি যখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, তখন কোনো ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি থাকে না। সরকারের উচিত এখনই ডিসিসিআই-এর প্রস্তাবনাগুলো আমলে নিয়ে একটি জবাবদিহিমূলক বাণিজ্যিক পরিবেশ তৈরি করা। অন্যথায়, ব্যবসায়ীদের এই ‘এক্সিট প্ল্যান’ বা ব্যবসা বন্ধের হুমকি ভবিষ্যতে দেশের জন্য এক বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।