রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে বাস পড়ে যাওয়ার ঘটনায় শোকের ছায়া আরও ঘনীভূত হয়েছে। গত বুধবারের সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৬ জনের প্রাণহীন দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া এই লাশের তালিকায় উঠে এসেছে বুকফাটা সব যন্ত্রণার গল্প। কোনো পরিবার হারিয়েছে তাদের তিন প্রজন্মকে—মা, ছেলে ও নাতি; কোথাও স্বামী-স্ত্রী আবার কোথাও মা-মেয়ের সলিল সমাধি ঘটেছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া সব মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, যার মধ্যে রাজবাড়ী জেলারই রয়েছে ১২টি পরিবারের ১৮ জন সদস্য। বাকিরা কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, গোপালগঞ্জ ও দিনাজপুরের বাসিন্দা।
দুর্ঘটনার নেপথ্যে থাকা কারণগুলো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সামনে এসেছে ফেরিঘাটের চরম অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত জরাজীর্ণতার চিত্র। সরেজমিনে দেখা গেছে, দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটের পন্টুনটি অত্যন্ত পুরোনো এবং এতে কোনো ধরনের নিরাপত্তাবেষ্টনী বা লোহার রেলিং নেই। পন্টুনটি অরক্ষিত থাকায় নিয়ন্ত্রণ হারানো বাসটি কোনো বাধা ছাড়াই সরাসরি নদীতে তলিয়ে যায়। স্থানীয় পরিবহন শ্রমিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, যদি পন্টুনে একটি মজবুত রেলিং থাকত, তবে হয়তো বাসটি আটকে যেত এবং ২৬টি তাজা প্রাণ এভাবে ঝরে পড়ত না। শুধু ৩ নম্বর ঘাটই নয়, ৪ ও ৭ নম্বর ঘাটেও একই রকম অরক্ষিত অবস্থা বিরাজ করছে।
ঘাটের বিশৃঙ্খল পরিচালনাও এই দুর্ঘটনার জন্য সমানভাবে দায়ী বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী, ফেরি থেকে সব গাড়ি নামার পর অপেক্ষমাণ গাড়িগুলো ওঠার কথা। কিন্তু ঘটনার দিন ‘হাসনাহেনা’ নামের একটি ছোট ফেরি পন্টুনে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ভেড়ার সময় বাসের চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। বিআইডব্লিউটিসি-এর কেউ কেউ একে ‘ব্রেক ফেইল’ বলে দাবি করলেও চালকদের মতে, ঘাটের সংযোগ সড়কগুলো অত্যন্ত ঢালু ও খানাখন্দে ভরা। ফলে ভারী বোঝাই গাড়ি নিয়ে ঢালু পথে ব্রেক নিয়ন্ত্রণ করা প্রায়ই অসম্ভব হয়ে পড়ে। ইতিপূর্বেও এই ঘাটে লরি ও ট্রাক নদীতে পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
এই ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনায় বর্তমানে দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি কাজ করছে। রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন থেকে পাঁচ সদস্যের এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে ছয় সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। উভয় কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য তাৎক্ষণিক ২৫ হাজার টাকা প্রদান করা হচ্ছে এবং আহতদের জন্য ১৫ হাজার টাকা করে সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিসি-এর চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ ঘাট পরিদর্শন করে ভবিষ্যতে পন্টুনে রেলিং স্থাপন এবং কর্মীদের আধুনিক প্রশিক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, কেন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ফেরিঘাট এতদিন ধরে মৃত্যুফাঁদ হয়ে পড়ে ছিল? ফায়ার সার্ভিস আপাতত উদ্ধার অভিযান স্থগিত করলেও জানিয়েছে, নতুন কোনো নিখোঁজের তথ্য পাওয়া মাত্রই ডুবুরি দল পুনরায় নদীতে নামবে। আপাতত পরবর্তী বড় কোনো অঘটনের আশঙ্কায় এবং নিখোঁজদের সন্ধানে শুক্রবার সকাল থেকে আবারও তল্লাশি কার্যক্রম চালানোর প্রস্তুতি রয়েছে।
সরেজমিনে তদন্ত এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় দুর্ঘটনার বেশ কিছু ভয়াবহ কারণ উঠে এসেছে:
অরক্ষিত ও রেলিংবিহীন পন্টুন: ৩ নম্বর ঘাটের পন্টুনটি অত্যন্ত পুরোনো এবং এতে কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী বা রেলিং নেই। ফলে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর সরাসরি নদীতে পড়ে যায়। চালক ও শ্রমিকদের দাবি, রেলিং থাকলে হয়তো বাসটি আটকে যেত এবং এত মানুষের মৃত্যু হতো না।
বিপজ্জনক সংযোগ সড়ক: ঘাট এলাকা ও পন্টুন পর্যন্ত সংযোগ সড়কগুলো অত্যন্ত ঢালু এবং খানাখন্দে ভরা। ভারী যানবাহন নিয়ে এই ঢালু পথে নামার সময় অনেক সময় ব্রেক নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ঘাট পরিচালনায় বিশৃঙ্খলা: নিয়ম অনুযায়ী ফেরি থেকে গাড়ি নামার পর নতুন গাড়ি ওঠার কথা থাকলেও, অনেক সময় আগে ওঠার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় যানবাহনগুলো। দুর্ঘটনার দিনও ‘হাসনাহেনা’ ফেরিটি প্রস্তুত হওয়ার আগেই বাসটি পন্টুনে চলে আসে এবং একটি ফেরির ধাক্কায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি নদীতে তলিয়ে যায়।
বিআইডব্লিউটিসি-এর চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ ঘাট পরিদর্শন শেষে জানান, পন্টুনগুলোতে দ্রুত রেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে এবং দায়িত্বরত কর্মীদের আধুনিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে। তবে স্থানীয় কর্মকর্তাদের কেউ কেউ একে ‘চালকের ভুল’ বা ‘ব্রেক ফেইল’ হিসেবে অভিহিত করছেন। অন্যদিকে, নিখোঁজদের স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে আছে দৌলতদিয়া ঘাট। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, নতুন করে কেউ নিখোঁজের তথ্য দিলে তাৎক্ষণিক উদ্ধার অভিযান আবারও শুরু করা হবে।