শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৩ অপরাহ্ন

সাড়ে পাঁচ বছরে শাহজালালে ৪৭ মণ সোনা জব্দ: নেপথ্যে আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১ বার
প্রকাশ: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬
সোনা

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সোনা চোরাচালান চক্রগুলোর তৎপরতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য ও মামলার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত গত সাড়ে পাঁচ বছরে এই বিমানবন্দর থেকে শতাধিক অভিযানে মোট ১ হাজার ৯০২ কেজি বা প্রায় ৪৭.৫৫ মণ চোরাচালানের সোনা জব্দ করা হয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, জব্দকৃত এই বিপুল পরিমাণ সোনার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। একের পর এক বড় চালান ধরা পড়লেও নেপথ্যের মূল হোতারা অধরা থেকে যাওয়ায় এই বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক চোরাকারবারিদের অন্যতম প্রধান করিডোরে পরিণত হয়েছে।

বিমানবন্দর ও কাস্টমস সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে শাহজালাল বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ প্রায় ৬৯৮ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়েছিল। পরবর্তী ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৫৫ কেজি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪১৭ কেজি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৯ কেজি সোনা জব্দ করা হয়। আর চলতি ২০২৬ বছরের এ পর্যন্ত জব্দ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬৩ কেজি সোনা। বিমানবন্দর থানা সূত্রের খবর, এই সাড়ে পাঁচ বছরে সোনা চোরাচালানের অভিযোগে মোট ৫৪০টি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ ঘটনায় কেবল সোনা পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হওয়ায় বা বাহক পালিয়ে যাওয়ায় সিংহভাগ মামলার এজাহারেই আসামির নাম ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ হিসেবে নথিভুক্ত করতে হয়েছে।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে আসা বাংলাদেশ বিমানলাইন্সের বিজি-১৪৮ ফ্লাইটের কার্গো হোল্ড থেকে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা মূল্যের ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম (১৬০টি বার) সোনার একটি বড় চালান জব্দ করে কাস্টমস ও এভসেকের যৌথ দল। এর আগে গত ২৮শে মার্চও বিমানের আরেকটি ফ্লাইটের টয়লেট থেকে প্রায় সমপরিমাণ সোনা উদ্ধার করা হয়েছিল। তদন্তকারীরা বলছেন, পরপর দুটি চালানের ধরন ও পরিমাণের মধ্যে মিল থাকায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও বিমানের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম জানিয়েছেন, ব্যক্তির অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না এবং তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কেন্দ্রিক প্রায় ৭০টি সক্রিয় সিন্ডিকেট এই নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত, যার মধ্যে বিদেশে অবস্থানকারী এক ডজনেরও বেশি প্রভাবশালী বাংলাদেশির নাম রয়েছে। চোরাকারবারিরা বাংলাদেশকে মূলত প্রতিবেশী দেশ ভারতের একটি ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে; কারণ বাংলাদেশে প্রতি ১০ গ্রাম সোনার শুল্কের তুলনায় ভারতে শুল্কের হার অনেক বেশি। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ওপারে সোনা পাচারের এই লাভজনক ব্যবসার কারণে চক্রগুলো বারবার ঢাকাকে বেছে নিচ্ছে। পাচারের জন্য তারা বিমানের সিট, টয়লেট, কার্গো হোল্ড থেকে শুরু করে হুইলচেয়ার, জুতা, ল্যাপটপের ব্যাটারি কিংবা সরাসরি মলদ্বারে সোনা লুকানোর মতো অভিনব সব কৌশল ব্যবহার করছে।

শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ এবং ঢাকা কাস্টম হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার মুহাম্মদ কামরুল হাসান জানান, বর্তমানে বিমানবন্দরে স্ক্যানিং ও আন্তঃসংস্থার সমন্বয় আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী করা হয়েছে এবং কড়া নজরদারির কারণেই এই চালানগুলো ধরা পড়ছে। তবে অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বিমানবন্দরে তল্লাশি চালিয়ে এই আন্তর্জাতিক চক্রকে নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর জন্য সোনা আসার মূল পয়েন্ট দুবাইসহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সাথে শক্তিশালী কূটনৈতিক সমন্বয় এবং ইন্টারপোলের সহায়তায় বিদেশে থাকা মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

 

তথ্যসূত্র: কালের কণ্ঠ


এ জাতীয় আরো খবর...