রাজশাহী অঞ্চলে শিশুদের মাঝে সংক্রামক ব্যাধি হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের নমুনা পরীক্ষা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) হামের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। সংগৃহীত নমুনাগুলো ঢাকায় নিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং এখন পর্যন্ত হাম শনাক্তের হার প্রায় ২৯ শতাংশ। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহের মাঝামাঝি থেকে রাজশাহী বিভাগের হাসপাতালগুলোতে হামের লক্ষণ নিয়ে শিশুরা ভর্তি হতে শুরু করে। ১৮ মার্চ পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৫৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৪৪ জনের পজিটিভ রিপোর্ট পেয়েছে।
হামের মতো ছোঁয়াচে রোগ পজিটিভ বা উপসর্গ থাকা শিশুদের হাসপাতালে আলাদা রাখার পরামর্শ দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না, বিশেষ করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে। এখানে শিশু ওয়ার্ডে সাধারণ রোগীদের সঙ্গেই হামের উপসর্গ থাকা শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অথচ এ ধরনের রোগীদের আলাদা আইসোলেশন ব্যবস্থায় রাখার নিয়ম রয়েছে। রাজশাহীতে একটি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল থাকলেও রামেক হাসপাতাল থেকে এখন পর্যন্ত কোনো রোগীকে সেখানে স্থানান্তর করা হয়নি। যদিও রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস দাবি করেছেন, উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শিশু ওয়ার্ডে সরাসরি হামের উপসর্গ নিয়ে অনেক শিশুকে ভর্তি থাকতে দেখা গেছে।
ভর্তি হওয়া শিশুদের মধ্যে অনেকেই গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় তাদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে আইসিইউতে নিয়েও সবাইকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। গত বৃহস্পতিবার দুর্গাপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং কুষ্টিয়ার কয়েকজন শিশুকে আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে হুমায়রা ও ফারহানা নামের দুই শিশু শুক্রবার সকালে মারা যায়। অন্য দুই শিশুকে এখনো সাধারণ ওয়ার্ডেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের জহির নামের আড়াই মাস বয়সি এক শিশুর মৃত্যু সনদে হাম-এর উল্লেখ পাওয়া গেছে। শিশুটির মা জেসমিন খাতুন জানিয়েছেন, তাঁর সন্তানকেও আলাদা না রেখে সাধারণ ওয়ার্ডেই চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল এবং ভর্তি হওয়ার তিন দিনের মাথায় ১৮ মার্চ সকালে শিশুটি মারা যায়। রামেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শাহিদা ইয়াসমিন জানিয়েছেন, ডব্লিউএইচও ইতোমধ্যে ১০টি নমুনায় হাম নিশ্চিত করেছে এবং বাকি নমুনাগুলোতেও একই লক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে।
রামেক হাসপাতালে হামে আক্রান্ত যে চার শিশুকে বৃহস্পতিবার আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল, তাদের তিনজনই মারা গেছে। বেঁচে থাকা শিশু জান্নাতুল মাওয়াকে গতকাল আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে এবং পাশাপাশি আরও তিন শিশুকে আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। চলতি মাসে রামেক হাসপাতালে হামে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে আইসিইউতে নেওয়ার পরেও ৯ জনকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শঙ্কর কে বিশ্বাস জানিয়েছেন, একটি বৈঠকের পর শনিবার থেকে আলাদা ওয়ার্ড করা সম্ভব না হলেও ২৪ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডে আইসোলেশন কর্নার করা হয়েছে এবং সেখানে রেখেই হামের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালেও হামের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। শনিবার সেখানে ৭০ জন শিশু হাম ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল, বিকালে ছুটি দেওয়ার পর প্রায় ৫০ জন শিশু ছিল। তিন মাসে সেখানে চারজন মারা গেছে, যার মধ্যে চলতি মাসেই দুজন।