বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতিতে চৈত্র সংক্রান্তি এক বিশেষ মাহাত্ম্য বহন করে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পাহাড়ি জনপদে এই সময়টি আসে বছরের সবচেয়ে বড় উৎসবের বার্তা নিয়ে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’ ও চৈত্র সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে এক বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী ১৩ এপ্রিল (সোমবার) রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এই তিন পার্বত্য জেলায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
রোববার (৫ এপ্রিল) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে এই ছুটির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ফরিদা ইয়াসমিন স্বাক্ষরিত এই আদেশে বলা হয়েছে, চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান পালনের সুবিধার্থে এই সাধারণ ছুটি কার্যকর হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, কেবল তিন পার্বত্য জেলাই নয়, দেশের অন্যান্য স্থানে বসবাসরত সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর সরকারি কর্মচারীরাও এই দিনটিকে ‘ঐচ্ছিক ছুটি’ হিসেবে গ্রহণ করতে পারবেন। অর্থাৎ, সমতলে বসবাসরত চাকমা, মারমা বা ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষেরাও যেন তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী বছরের শেষ দিনটি উদযাপন করতে পারেন, সেই সুযোগ রাখা হয়েছে।
তিন পার্বত্য জেলায় চৈত্র সংক্রান্তির এই দিনটি মূলত বৈসাবি উৎসবের সূচনালগ্ন। পাহাড়ি তিনটি প্রধান সম্প্রদায়ের উৎসবের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে এই ‘বৈসাবি’ (ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই এবং চাকমাদের বিজু) উৎসবের নামকরণ। ১৩ এপ্রিল পাহাড়িদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র এবং আনন্দময় একটি দিন। এই দিনে তারা পুরোনো বছরের সব দুঃখ-গ্লানি মুছে ফেলে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার প্রস্তুতি নেয়।
রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় তখন সাজ সাজ রব থাকে। চৈত্র সংক্রান্তির ভোরে পবিত্র নদীতে ফুল ভাসিয়ে শুরু হয় ‘ফুল বিজু’। এরপর বাড়ি ঘর সাজানো, পাচন রান্না এবং আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাতায়াতের মাধ্যমে ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য মেলবন্ধন তৈরি হয়। সাধারণ ছুটি ঘোষণার ফলে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মজীবীরা পরিবার-পরিজনের সাথে উৎসবে মেতে ওঠার পূর্ণ সুযোগ পাবেন।
সাধারণত এই সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটকদের ভিড় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তিন জেলায় সাধারণ ছুটি থাকায় স্থানীয় বাজার এবং উৎসব কেন্দ্রগুলোতে জনসমাগম আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বান্দরবানের সাংগ্রাই উৎসবের পানি খেলা (জলকেলি), খাগড়াছড়ির বৈসু উৎসবের গরাইয়া নাচ এবং রাঙামাটির বিজু উৎসবের বর্ণিল আয়োজন দেখতে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ভিড় জমান। সরকারের এই ছুটির সিদ্ধান্ত কেবল উৎসব পালনেই সহায়তা করবে না, বরং পাহাড়ি অঞ্চলের পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিশেষ উৎসবের দিনে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি অনন্য উদাহরণ। বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার যে বহিঃপ্রকাশ, তা এই ধরণের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আরও সুসংহত হয়। চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈসাবি কেবল পাহাড়ের নয়, এটি এখন পুরো বাংলাদেশের এক অবিচ্ছেদ্য সাংস্কৃতিক অংশ।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপ পাহাড়ি ও সমতলের মানুষের মধ্যে যে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন রয়েছে, তাকে আরও দৃঢ় করবে। বিশেষ করে যারা কর্মব্যস্ততার কারণে দীর্ঘদিন বাড়িতে যেতে পারেন না, এই একদিনের সাধারণ ছুটি তাদের শেকড়ের টানে ফিরে যেতে উৎসাহিত করবে।
ছুটি ঘোষণার পর থেকেই তিন পার্বত্য জেলায় স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা ও উৎসব প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়েছে। পাহাড়ি জনপদে যেন কোনো ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই উৎসব সম্পন্ন হয়, সেজন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, চৈত্র সংক্রান্তির দিনে সাধারণ ছুটি তাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল, যা উৎসবের আনন্দকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আগামী ১৩ এপ্রিল পাহাড়ের সবুজ বুক চিরে শুরু হবে নতুন সুরের মূর্ছনা। জলকেলি আর বর্ণিল সাজে সেজে উঠবে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান। চৈত্র সংক্রান্তির বিদায়ী সূর্য নতুন এক ভোরের স্বপ্ন নিয়ে আসবে পাহাড়ি মানুষের জীবনে।