উন্নত জীবনের হাতছানি আর দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্তি পেতে সমুদ্রের মরণফাঁদে পা দিয়ে আবারও ট্র্যাজেডির শিকার হলেন শতাধিক অভিবাসনপ্রত্যাশী। ভূমধ্যসাগরের উত্তাল নীল জলরাশি এবার কেড়ে নিয়েছে অন্তত ৭০টি তাজা প্রাণ। লিবীয় উপকূল থেকে ইতালির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া জরাজীর্ণ একটি কাঠের নৌযান ডুবে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। ইতালীয় কোস্টগার্ড ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর নিরলস প্রচেষ্টায় ৩২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি নাগরিক রয়েছেন। তবে নিখোঁজ ৭০ জনের মধ্যে নারী ও শিশু থাকায় শোকের ছায়া আরও ঘনীভূত হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া ৩২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীই পুরুষ। তারা বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মিসরের নাগরিক। ইতালির ল্যাম্পেদুসা দ্বীপে পৌঁছানোর পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানান, সাগরের দানবীয় ঢেউ আর প্রচণ্ড বাতাসের তোড়ে তাদের ছোট কাঠের নৌকাটি খড়কুটোর মতো কাঁপছিল। এক পর্যায়ে বিশাল একটি ঢেউয়ের আঘাতে নৌকাটি মাঝ সমুদ্রে উল্টে যায়। মুহূর্তের মধ্যে কান্নার রোল আর বাঁচার আকুতিতে ভারী হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস। উদ্ধারকৃতদের অনেকেই নৌকার তলদেশ ধরে কয়েক ঘণ্টা ভেসে থেকে অলৌকিকভাবে প্রাণ ফিরে পেয়েছেন।
জার্মান উদ্ধারকারী সংস্থা ‘সি-ওয়াচ’ এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার প্রথম সংকেত পায়। তাদের পাঠানো পর্যবেক্ষণ বিমান থেকে তোলা ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, উত্তাল সাগরে উল্টে যাওয়া একটি কাঠের নৌকার ওপর ১০-১২ জন মানুষ জবুথবু হয়ে বসে আছেন। চারদিকে শুধুই অথৈ পানি আর লাশের সারি। ইতালীয় কোস্টগার্ড এবং এনজিও ‘মেডিটেরেনিয়া সেভিং হিউম্যান’ (MSH) দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ৩২ জনকে জীবিত এবং ২ জনের নিথর দেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। তবে বাকি ৭০ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
নিখোঁজ যাত্রীরা গত শনিবার বিকেলে লিবিয়ার উপকূলীয় শহর তাজাউর থেকে নৌকায় উঠেছিলেন। গন্তব্য ছিল স্বপ্নের ইউরোপ। কিন্তু লিবিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় তেলের খনি ‘বৌরি অয়েল ফিল্ড’ থেকে মাত্র ১৪ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পূর্বে পৌঁছাতেই নৌকাটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। নৌযানটিতে মোট ১০৫ জন যাত্রী ছিলেন, যা এর ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। মানবপাচারকারী চক্রগুলো লাভের আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এভাবে গাদাগাদি করে মানুষ পাঠায়, যার শেষ পরিণতি হয় এই ধরণের করুণ মৃত্যু।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর এখন বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক অভিবাসন রুট। প্রতি বছর এশিয়া ও আফ্রিকার হাজার হাজার মানুষ এই পথ ব্যবহার করে ইতালি বা গ্রিসে ঢোকার চেষ্টা করেন। ২০২৬ সালের শুরু থেকেই এই মিছিলে লাশের সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অন্তত ৭২৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী নিখোঁজ হয়েছেন। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৬ জন মানুষ এই নীল জলরাশিতে হারিয়ে যাচ্ছেন।
এই দুর্ঘটনার পর ‘মেডিটেরেনিয়া সেভিং হিউম্যান’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) বিশ্বনেতাদের প্রতি এক আবেগঘন বার্তা দিয়েছে। তারা নিখোঁজদের প্রতি শোক প্রকাশ করে বলেছে, ইউরোপীয় দেশগুলোকে এখনই একটি ‘নিরাপদ ও মানবিক অভিবাসন নীতি’ গ্রহণ করতে হবে। বৈধ পথে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় এবং দারিদ্র্যের তাড়নায় মানুষ বাধ্য হয়ে দালালের খপ্পরে পড়ে এই মরণফাঁদে পা দিচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত না হবে, ততক্ষণ এই সলিল সমাধি থামানো সম্ভব নয়।
উদ্ধারকৃতদের মধ্যে বাংলাদেশিদের নাম আসায় দেশের গ্রামাঞ্চলে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। উন্নত জীবনের আশায় ভিটেমাটি বিক্রি করে যারা দালালের হাতে লাখ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন, তাদের অনেকে আজ নিখোঁজ। উদ্ধারকৃতরা ল্যাম্পেদুসা দ্বীপে চিকিৎসাধীন থাকলেও তাদের চোখেমুখে এখনও সেই যমদূতের ভয় লেগে আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল বিদেশের মাটিতে উদ্ধার করলেই হবে না, বরং দেশের অভ্যন্তরে মানবপাচারকারী চক্রগুলোর শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে এবং জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
ভূমধ্যসাগরের এই ট্র্যাজেডি আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, অনিশ্চিত পথে সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন কতটুকু ভয়াবহ হতে পারে। যে ৭০ জন হারিয়ে গেলেন, তারা হয়তো কোনো পরিবারের একমাত্র উপার্জক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তাদের ফেরার অপেক্ষায় থাকা মা-বাবা বা সন্তানদের আহাজারি সমুদ্রের গর্জনে চাপা পড়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু বিশ্ববিবেকের কাছে প্রশ্ন থেকে যাবে—আর কত প্রাণের বিনিময়ে জাগবে এই মানবতা? মৃত্যুমিছিল কি তবে চলতেই থাকবে?
প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র:
মোট যাত্রী: ১০৫ জন।
নিখোঁজ: ৭০ জন (নারী ও শিশুসহ)।
জীবিত উদ্ধার: ৩২ জন (বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মিসরের নাগরিক)।
উদ্ধারকৃত স্থান: ইতালির ল্যাম্পেদুসা দ্বীপ।
২০২৬ সালের পরিসংখ্যান: ৭২৫ জন নিখোঁজ (জানুয়ারি-এপ্রিল)।