শিরোনামঃ
বাড়ি ভাড়া নেওয়ার আগে: ১০টি পরামর্শ ডাকলেই কাছে চলে আসবে টয়লেট! মানুষের জীবনমানের উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়ন: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী রাজনীতিবিদদের ভুল তুলে ধরা সাংবাদিকদের দায়িত্ব: মির্জা ফখরুল খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন বিদেশি অতিথি ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা তেহরানে গালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন এলপিজির দাম কমেছে, ধাপে ধাপে জ্বালানি তেলও কমানো হবে: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ফুটবল দর্শনে দেশীয় ফুটবলের রূপান্তর পরিকল্পনা সাঈদীর সাক্ষী সুখরঞ্জন বালী অপহরণ মামলায় সাবেক এএসপি গ্রেপ্তার তেহরানে খামেনির জানাজায় রেকর্ড জনসমাগমের আশা
শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ১২:২০ পূর্বাহ্ন

১৩ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তায় ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ইসলামী ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬

কয়েক সপ্তাহ আগেও দেশের অন্যতম বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’ এক নজিরবিহীন ও চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল যে, এই ব্যাংকের ইস্যু করা পে-অর্ডার অন্য কোনো ব্যাংক গ্রহণ করতে চাচ্ছিল না, সচল আরটিজিএস (RTGS) লেনদেন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছিল এবং সাধারণ আমানতকারীরা নিজেদের জমানো মাত্র এক লাখ টাকা তুলতে গিয়েও চরম হিমশিম খাচ্ছিলেন। ধ্বংসের ঠিক কিনারা থেকে অবিশ্বাস্যভাবে এখন আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে এই বিশাল আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি। সরকারের কিছু কঠোর, চারমুখী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেকর্ড পরিমাণ তারল্য সহায়তার ফলে ব্যাংকটির প্রতি গ্রাহকদের আস্থা দ্রুত ফিরে আসছে। একই সঙ্গে, দেশের ব্যাংকিং খাতে এক সময়ের বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের পুনঃপ্রবেশের আইনি পথও এখন চিরতরে রুদ্ধ হয়ে গেছে।

এই চরম তারল্য ও আস্থার সংকটের সূত্রপাত হয়েছিল গত ২৪শে মে। বাংলাদেশ ব্যাংক যখন এস আলম গ্রুপের ঘনিষ্ঠ সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত খুরশিদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়, তখন থেকেই ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। এই বিতর্কিত নিয়োগের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে আন্দোলনে নামে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’। পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে যখন তৎকালীন সরকারের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর একটি বিতর্কিত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এর ফলে সাধারণ আমানতকারীদের মনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সবাই একসাথে ব্যাংক থেকে নিজেদের জমানো আমানত তুলে নেওয়ার জন্য শাখায় শাখায় ভিড় করতে শুরু করেন। গ্রাহকদের এই হিড়িকের কারণে ব্যাংকটিতে রাতারাতি এক তীব্র ও নজিরবিহীন তারল্য সংকট দেখা দেয়।

পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত ও আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষা করতে জরুরি ভিত্তিতে হস্তক্ষেপ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিতর্কিত চেয়ারম্যান খুরশিদ আলমকে পদ থেকে অপসারণ করা হয় এবং পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে অন্তর্বর্তীকালীন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়ে ব্যাংকটির দৈনিক কার্যক্রম কঠোরভাবে তদারকি করা হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবরটি আসে গত ৩০শে জুন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণার মঞ্চ থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানান, ইসলামী ব্যাংকের বিশাল গ্রাহক ভিত্তি এবং দেশের অর্থনীতিতে এর গভীর প্রভাব বিবেচনা করে ব্যাংকটিকে সচল রাখতে এ পর্যন্ত রেকর্ড ১৩ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। গভর্নর সাধারণ গ্রাহকদের কোনো ধরনের আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানিয়েছেন এবং প্রয়োজনে এই আর্থিক ব্যাকআপ আরও দীর্ঘ সময় অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছেন।

ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য এর চেয়েও বড় আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তির বার্তা এসেছে দেশের জাতীয় সংসদ থেকে। ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬’-এর বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ‘১৮ ক’ ধারাটি সম্পূর্ণ বাতিল করার ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মূলত এই বিশেষ ধারাটির আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পূর্বের লুটেরা মালিকরা পুনরায় ব্যাংকটির মালিকানায় ও নিয়ন্ত্রণে ফেরার অলীক স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু মন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা জনগণের আমানত ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করেছে, তাদের বর্তমান সরকার কোনোভাবেই ছাড় দেবে না। একীভূত বা দেউলিয়া হওয়া কোনো দুর্বল ব্যাংকের আগের বিতর্কিত মালিকরা আর কখনোই ব্যাংকের মালিকানায় বা পর্ষদে ফিরে আসতে পারবেন না। এই যুগান্তকারী আইনি সংশোধনের মাধ্যমে এস আলম গ্রুপের ব্যাংকিং খাতে ফিরে আসার পথ রাষ্ট্র চিরতরে বন্ধ করে দিল।

সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই চারমুখী কঠোর অ্যাকশনের সুফল ইতিমধ্যেই মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, সাধারণ গ্রাহকদের মনে থাকা পুরোনো ভয় ও আতঙ্ক এখন পুরোপুরি কেটে গেছে। শাখাগুলো থেকে প্যানিক উইথড্র বা আতঙ্কিত হয়ে টাকা তুলে নেওয়ার প্রবণতা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে উল্টো প্রতিদিন নতুন আমানত জমার পরিমাণ বাড়ছে। আগে যেখানে টাকা তোলার ওপর কঠোর দৈনিক লিমিট বা বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছিল, এখন ব্যাংকটির যেকোনো শাখা ও এটিএম বুথ থেকে অনায়াসেই লাখ লাখ টাকা তুলতে পারছেন গ্রাহকরা। ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের উত্থাপিত ৭ দফা দাবির মধ্যে ৩টি প্রধান দাবি—চেয়ারম্যান অপসারণ, পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং বৈষম্যমূলক ১৮ ক ধারা বাতিল—ইতিমধ্যেই সরকার শতভাগ বাস্তবায়ন করেছে।

ইসলামী ব্যাংকের এই নজিরবিহীন সংকট কাটাতে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের বিশাল সামষ্টিক আর্থিক চ্যালেঞ্জের এক চাঞ্চল্যকর তথ্যও সামনে এসেছে। গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো আমলে দেশের বিভিন্ন সংকটাপন্ন ব্যাংককে মোট ১৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। অথচ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতকে সচল ও টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন ব্যাংককে এ পর্যন্ত প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকার বিশাল আর্থিক সহায়তা দিতে হয়েছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম চার মাস কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কোনো নতুন তারল্য সহায়তা দিতে না হলেও, দেশের বৃহত্তম রিটেইল ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের সুরক্ষায় কেবল এই একটি ব্যাংকেই বিশেষ বিবেচনায় ১৩ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।

সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর বাংলাদেশ ব্যাংক এখন আরও শক্ত ও আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এক কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন যে, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, ইউনিয়নবাজি বা কায়েমি স্বার্থসংশ্লিষ্ট তৎপরতা আর কোনো অবস্থাতেই বরদাস্ত করা হবে না। দেশের আর্থিক ব্যবস্থার এই লাইফলাইনকে সম্পূর্ণ পেশাদারিত্বের সাথে পরিচালনা করতে খুব দ্রুতই দেশের সৎ, যোগ্য ও নিরপেক্ষ আর্থিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ স্থায়ী পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হবে। তবে দেশের অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িক এই তারল্য বা নগদ টাকার সহায়তা দিয়ে ইসলামী ব্যাংককে হয়তো সচল রাখা গেছে, কিন্তু ব্যাংকটির সামনে আসল চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘমেয়াদি ও মৌলিক সংস্কার। যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—বিগত বছরগুলোতে এস আলম গ্রুপ ও তাদের সিন্ডিকেট কর্তৃক ব্যাংকটি থেকে বেনামে লুটে নেওয়া বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ দ্রুত পুনরুদ্ধার করা এবং বিদেশে অবৈধভাবে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা। এই লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগই কেবল পারবে দেশের সাধারণ মানুষের মনে এই ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকের প্রতি হারিয়ে যাওয়া পূর্ণ আস্থা চিরতরে ফিরিয়ে আনতে।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪


এ জাতীয় আরো খবর...