বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১২ পূর্বাহ্ন

তেল লুট: শাস্তির বদলে কেবল ‘বদলি’

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২৬ বার
প্রকাশ: বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬

জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে যখন সাধারণ মানুষ দিশেহারা, তখন রাষ্ট্রায়ত্ত তিন তেল কোম্পানির কর্মকর্তাদের মদদে প্রায় পৌনে দুই লাখ টন জ্বালানি তেল কালোবাজারে চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চ—এই সাত দিনে ডিলারদের অস্বাভাবিক পরিমাণে তেল উত্তোলনের সুযোগ করে দেয় পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি। এই মহাপ্রতারণার দায়ে বিপিসির (BPC) দুই পরিচালকসহ ১৪ কর্মকর্তাকে বদলি করা হলেও গঠন করা হয়নি কোনো তদন্ত কমিটি।

লুটপাটের চিত্র: ৭ দিনে ১৬ দিনের তেল

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, দেশে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ১১-১২ হাজার টন তেলের চাহিদা থাকে। কিন্তু ওই ৭ দিনে গড়ে প্রতিদিন ২৫ হাজার টন করে তেল ডিলারদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। যা স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। এই বিপুল পরিমাণ তেল দিয়ে দেশের ১৬ দিনের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা চালু রাখা সম্ভব ছিল।

সাঁড়াশি লুটপাটের পরিসংখ্যান

বিপিসি ও বিপণন কোম্পানিগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়:

  • মেঘনা অয়েল: ১-৫ মার্চের মধ্যে গড়ে প্রতিদিন ১০ হাজার টনের বেশি তেল বিক্রি করেছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে তিনগুণ।

  • পদ্মা অয়েল: ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চের মধ্যে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭ হাজার টন তেল সরবরাহ করেছে।

  • যমুনা অয়েল: এই কোম্পানিটিও একই হারে তেল ডিলারদের হাতে তুলে দিয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

দায় এড়ানোর চেষ্টা ও ‘হাস্যকর’ সাজা

এত বড় অনিয়মের ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানান, বিপিসির দুই পরিচালককে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত (ওএসডি) করা হয়েছে এবং বাকি ১২ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এত বড় আর্থিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষতির পরও কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি।

পদ্মা অয়েলের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যেখানে প্রতিদিনের বিক্রয় প্রতিবেদন যাচাই করার সুযোগ আছে, সেখানে সপ্তাহ ধরে অস্বাভাবিক উত্তোলন কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। লাখ টন তেল সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দিয়ে এখন হাজার লিটার তেল উদ্ধারে অভিযান চালানো কেবলই হাস্যকর।”

অস্বাভাবিক বিক্রির পরিসংখ্যান

একনজরে জ্বালানি তেল কেলেঙ্কারি (২৮ ফেব্রুয়ারি – ৬ মার্চ)
বিবরণ পরিমাণ/তথ্য
মোট উত্তোলিত তেল ১,৭৫,০০০ টন (প্রায়)
স্বাভাবিক দৈনিক চাহিদা ১১,০০০ – ১২,০০০ টন
অনিয়মের সময় দৈনিক বিক্রয় ২৫,০০০ টন
অব্যবহৃত তেলের স্থায়িত্বকাল ১৬ দিন
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ১৪ জন বদলি/ওএসডি
* সূত্র: বিপিসি ও রাষ্ট্রায়ত্ত তিন তেল বিপণন কোম্পানি

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের দোহাই দিয়ে সরকার যখন রেশনিং-এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ব্যবহার সীমিত করছে, তখন খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাকের ডগায় এমন বিশাল মজুত চুরি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে বড় হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বদলির মতো ‘লঘু দণ্ড’ এই সিন্ডিকেট ভাঙতে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।


এ জাতীয় আরো খবর...